ঢাকা-দিল্লীতে ৩৪ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর : তিস্তা যথারীতি খরচের খাতায় !

0
134

গোলাম সারোয়ার :: হায়দরাবাদ হাউজের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩৪ টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। তারমধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরো আছে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণা।

আর দুঃখের ব্যাপার হলো মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তির বিষয়ে এবারও কোন সমাধান হয়নি। ভারতীয় নেতৃত্ব তিস্তা প্রশ্নে যথারীতি মমতা’র ট্রাম কার্ডটি খেলে থাকেন। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর পূর্বসূরীদের মতো আবারো আশ্বাস দিয়েছেন, এই সমস্যা সমাধান একমাত্র তাঁদের সরকারই করতে পারবে। আমরা ধরে নিতে পারি যতদিন গেলানো যাবে তত দিল্লী এই মূলো ঝুলিয়ে রাখবে।

২০১০ সালের পর এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০টির বেশি চুক্তি হয়েছে। এগুলোর ভিতরে আছে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি। দুই প্রধানমন্ত্রী কলকাতা-খুলনা-ঢাকা বাস চলাচল এবং খুলনা-কলকাতা ট্রেন চলাচল, রাধিকারপুর-বিরল রেললাইন উদ্বোধন করেন ইত্যাদি ।

শুক্রবার ভারতীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘আকাশ প্রদীপ’ নয়াদিল্লির পালাম বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছায়।

এদিন সবাইকে অবাক করে প্রটোকল ভেঙে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে হাজির হন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিমানের গেটে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান তিনি। এ ঘটনাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গোপাল বাগলে ‘একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রতি উষ্ণ অভ্যর্থনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর কথা ছিল ভারতের হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ এন্ড পাবলিক এন্টারপ্রাইজ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় এবং বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর।

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর শেখ হাসিনাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন নরেন্দ্র মোদী। বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয় রাইসিনা হিলে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে।

এদিকে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে নিজের অবস্থান মোটেও বদলাননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা অব্যাহত রাখলেন এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্যে জলঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন।

শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের একপর্যায়ে মমতা ব্যানার্জিকে ডেকে নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ওই বৈঠকে যোগ দেন। সেখানেই মোদি তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তির বিষয়টি তোলেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক শেষে মমতা ব্যানার্জি সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তার সমস্যা নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে বলেছেন। জানিয়েছেন, তিস্তায় কোনো পানি নেই। পানির অভাবে এনটিপিসির বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেচের জন্য পানি পেতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গে তোর্সা, জলঢাকাসহ চারটি নদী আছে। সেখানে পানি আছে। ফলে তিস্তার বিকল্প হিসেবে এই চারটি নদীর পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

নানান টাল বাহানায় তিনি তিস্তার দিকে গেলেন না। তিনি গেলেন দুই বাংলায় দুই দিন কিভাবে পয়লা বৈশাখ উৎযাপন করা যায় সেদিকে।

ভারতের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, তিস্তা চুক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতি ছাড়া করা যাবে না। কিন্তু আমরা জানি ভারতের সংবিধান মতে এই বক্তব্য সঠিক নয়। অনেকে মনে করেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে, কিন্তু সাংবিধানিক বাধার কারণে তারা রাজ্যকে পাশ কাটাতে পারছে না । এটি একটি ভুল ধারণা।

প্রকৃত সত্য হলো, ভারতীয় সংবিধানে পানি রাজ্য তালিকায় আছে, কিন্তু সেটা শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ পানিবণ্টন, আহরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি কোনোভাবেই কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

ভারতীয় সংবিধানের একাদশ ভাগের ২৪৬ অনুচ্ছেদে আছে পানি রাজ্য তালিকা নিয়ে। এখানেই উল্লেখ আছে, পানি রাজ্যের বিষয় ঠিকই। কিন্তু যখন আন্তর্জাতিক চুক্তি করা হবে, তখন রাজ্যের কিছুই বলার থাকবে না।

ভারত যে অন্ধকে হাইকোর্ট দেখানোর মতো আমাদের বুঝায়, মমতার সম্মতি ছাড়া তিস্তা চুক্তি করা যাবে না, সেটা ভারতের সংবিধানের ২৫৩ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এই অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘এই অধ্যায়ে পূর্ববর্তী বিধানাবলি যাহা কিছু আছে তৎসত্ত্বেও, অন্য কোনো দেশের বা দেশসমূহের সহিত কোনো সন্ধি, চুক্তি বা কূটনৈতিক অঙ্গীকার অথবা কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পরিমেল বা অন্য সংস্থায় কৃত কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য ভারতের সমগ্র রাজ্য ক্ষেত্রের বা উহার কোনো ভাগের জন্য যেকোনো বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের আছে।’

সুতরাং তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যা খেলছে তাকে গ্রাম্য ভাষায় বলে দু’মুখো নীতি। মমতা তাঁর রাজ্যের কথা বলবেন। কিন্তু একজন মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতের সংবিধান না মেনে পারবেন না। তিস্তার ব্যাপারে আমরা যে দরকষাকষিতে হারছি তা আমাদেরও ব্যর্থতার দলিল। আমাদের কর্মকর্তারা এই বিষয়ে পুরোপুরি অপত্য শিশুসম। না পেরে তারাও ভারতীয় কৌশলের পক্ষে নয় ছয় বলছেন।

আমরা দেখলাম, ভারত ক্রমাগত লাভের পথেই হাঁটছে। ভারত ভুলে গেছে ক্রমাগত লাভের পথে যারা হাঁটে ইতিহাসে তারাই সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই অবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো, পূর্বমুখী যোগাযোগ বাড়ান। দিল্লিকে চাপে রাখা ছাড়া আর জিতার কোন মন্ত্র নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের যোগ্যতাও বাড়াতে হবে। সফর সঙ্গী হিসেবে বউ শালীসহ শত শত লোক গিয়ে আমাদের লাভটি কি হয়েছে ! এগুলো ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই মূল্যায়ন হবে। এখন যে কিছু লোক বিনে এনালাইসিসে ‘হরি বোল’ হরি বোল’ করছে তারা তখন থাকবে না। ইতিহাসের বিচার হয় সত্যের কষ্টি পাথরে ।

আমরা মনে রাখলাম, ভারত ব্রিটিস সাম্রাজ্য নয় আর মমতাও মার্গারেট থ্যাচার নয়। ভারত বন্ধুহীনতা, আস্থাহীনতার ষোলকলা পূর্ণ করে একদিন পুরুতদের হাতধরে পাতালের দিকে ধাবিত হবে। এই ভারত পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন কিভাবে দেখে ! চিন্তা ও মননে ভারত এখনও আফ্রিকার গহীন অরণ্যের অসভ্য জাতিদের মতো আচরণ করছে ধর্ম, সংস্কৃতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে! এই পথে উপমহাদেশে শান্তি বিপদের মুখেই রয়ে গেল।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে