নদী ভাঙনে বদলে যাচ্ছে বৃহত্তর নোয়াখালীর মানচিত্র

0
147

নিউজ ডেস্ক :: অশীতিপর আবদুল হাকিম। চার দফা নদীভাঙনের পর ভোলার বোরহানউদ্দিন ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন নোয়াখালীর হাতিয়ায়। পঞ্চম দফায় নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে সে আশ্রয়স্থলও। এর পর বনদস্যুদের কাছ থেকে একচিলতে জায়গা কিনে ঘর বানিয়েছিলেন সুবর্ণচর উপজেলার চর খন্দকার গ্রামে। নদীতে মাছ ধরে ও আশপাশের জমিতে সবজি চাষ করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু মাসকয়েক আগে ষষ্ঠবারের মতো নদীভাঙনে হারিয়ে যেতে বসেছে সে স্বপ্নও।

আবদুল হাকিমের মতোই প্রতি বছর নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলের অসংখ্য মানুষের বসতি। তবে সবচেয়ে বেশি নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে নোয়াখালীর সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ ও হাতিয়া উপজেলা। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর, রামগতি এবং ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মানুষ। ব্যাপক মাত্রার এ নদীভাঙন বদলে দিচ্ছে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের মানচিত্রও।

এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর, চর ফকিরা ও চর এলাহী এবং সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ও চর ক্লার্ক ইউনিয়নের উপকূলীয় অঞ্চল নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই এসব এলাকার শত শত পরিবার ঘরবাড়ি হারাচ্ছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল নদী ভাঙন প্রসঙ্গে বলেন, উপজেলার মুছাপুর, চরফকিরা ও চর এলাহী ইউনিয়নের প্রায় ছয়টি স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে দিয়ারা বালুয়া গুচ্ছগ্রাম, পূর্ব কচ্ছপিয়া, ভূমিহীন মার্কেট, চর ফকিরা ৬ নম্বর ওয়ার্ড, চর এলাহীর নারিকেল ব্যাপারীর দোকান থেকে গাংচিল পর্যন্ত। এসব এলাকার অন্তত ২০ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে এখন বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছে। এছাড়া আট কিলোমিটার পুরনো সড়ক ও ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ও চর ক্লার্ক ইউনিয়নের দক্ষিণ হেমায়েতপুর, চর বায়েজিদ মৌজা, চর খন্দকার, আলেমপুর, সৈয়দপুর, চর নোমান সমাজ ও চর মোজাম্মেল মৌজাসহ অন্তত ১০টি এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়েছে প্রায় তিন হাজার পরিবার। একই সঙ্গে নদীতে বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, সিডিএসপি-৪-এর সাত-আট কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও বন বিভাগের লক্ষাধিক গাছ। গত মাসেই চর ক্লার্ক ইউনিয়নের চর খন্দকারে সাবেক ২ নম্বর কাটাখালী স্লুইস গেটটি বিলীন হয়েছে। ফলে জোয়ারের সময় পানি দ্রুত সমতল ভূমির দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিলীনের হুমকিতে রয়েছে সোলেমান বাজার এলাকার বসতবাড়ি। দুই ইউনিয়নে ভাঙনের বিষয়ে মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এনামুল হক ও চর ক্লার্ক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল বাসার বলেন, ভাঙনের চিত্র উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও বিষয়টি অবগত।
https://www.noakhalitimes.com
হাতিয়া উপজেলা পরিষেদের চেয়ারম্যান মোর্শেদ লিটন জানান, হাতিয়ার মানুষ ভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে। উপজেলার তিন দিকই ভাঙছে। এর মধ্যে ছয়টি এলাকার ভাঙন সবচেয়ে তীব্র। এসব এলাকার ৩০ হাজারেরও বেশি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ ভাঙনের কবলে নিঃস্ব হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ পাঁচ-ছয়বার ভাঙনের শিকার হয়েছে। তবে ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোকে সমপরিমাণ সহযোগিতা বা পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি।

তবে নোয়াখালী জেলার তিন উপজেলা সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ ও হাতিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে ভাঙনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নোয়াখালী কার্যালয়ে। পাউবো কার্যালয়ে গেলে তাদের কাছে ক্ষয়ক্ষতির কোনো হিসাব নেই বলে জানান জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, তার কার্যালয় শুধু নদীভাঙন প্রতিরোধে পরিকল্পনা ও বাজেট প্রস্তাব করে।

প্রতিনিয়তই মেঘনার ভাঙন বাড়ছে ইলিশের জেলা লক্ষ্মীপুরে। নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। জেলার কমলনগর ও রামগতি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ভাঙনের শিকার হচ্ছে। এক দশক ধরে এলাকার ১৯টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চারটি বাজার, ছোটবড় ২৫টি গ্রাম ও বসতবাড়িসহ প্রায় ৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ তাদের ভিটেমাটিসহ সর্বস্ব হারিয়েছে। বর্তমানে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার আটটি স্থানে মেঘনা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। কমলনগরের নাছিরগঞ্জ থেকে দক্ষিণ দিকে ১৫টি পয়েন্টে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনপ্রবণতা বেশি। টানা ভাঙনে এরই মধ্যে উপজেলার শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কাদির পণ্ডিতের হাট ও লুধুয়া বাজারের ছোটবড় সহস্রাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রামগতি এলাকায়ও দেখা যায় ভাঙনের করুণ চিত্র। চর আবদুল্যাহ ইউনিয়ন পুরোটাই নদীতে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে চর আলেকজান্ডার ইউনিয়ন, রামগতি পৌরসভা, চর আলগী ইউনিয়ন, চর রমিজ, বড়খেরী ইউনিয়ন, রামগতির ঐতিহ্যবাহী দায়রাবাড়ি ও রামগতি বাজার মেঘনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে।

চলতি বছর মেঘনা-তীরবর্তী এলাকা ভয়াবহ মাত্রায় ভাঙনের শিকার হচ্ছে জানিয়ে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্যাহ আল মামুন বলেন, প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো কমলনগরের কাদির পণ্ডিতের হাট ও লুধুয়া বাজার কিছুদিন আগে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চলা এ ভাঙন প্রতিরোধে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কিছু কাজ করা হয়েছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নব্যতা বাড়ানো ও তীর সংরক্ষণ করা গেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব।

https://www.noakhalitimes.comফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় দক্ষিণ চর চান্দিয়া, পূর্ব চর চান্দিয়া, চর দরবেশ, চর খোয়াজ, চর খোন্দকার, চর নারায়ণ, চর ধলি, চর সাহাপুর, সুজাপুর, চর সোনাপুর, চর গণেশ, চর ধুমা ও বাদামতলী এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এসব এলাকার শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, ঐতিহ্যবাহী হাটবাজার ও কবরস্থান এখন শুধুই স্মৃতি।

ফেনীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মুহুরী, কুহুয়া, ছিলোনীয়া ও ছোট ফেনী নদীর দুই পাড়ে ভাঙন বেড়েছে। এসব নদীর পাড় ভাঙনের ফলে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার উত্তর শালধর, পশ্চিম ধনিয়া মোড়, জয়পুর, বিজয়পুর, দৌলতপুর, শাহাপুর, নোয়াপুর, বদরপুর, মণিপুর, সুভার বাজার, গদানগর, শালধর, ধনিকুণ্ডা, ধর্মপুর, বরইয়া, বসন্তপুর ও ফেনী সদরের মোবারক ঘোনা এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান জেডএম কামরুল আনাম নদীভাঙন বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ফেনী নদীর বাঁকা অংশ খননের মাধ্যমে সোজা করা ও মুছাপুর ক্লোজারের কারণে উপকূল অঞ্চলের ভাঙনের তীব্রতা কমে এসেছে। তবে এ মুহূর্তে উপজেলার চর মজলিশপুর ইউনিয়নের বিষ্ণপুর, চান্দলা, আমিরাবাদ ইউনিয়নের আহমেদপুরসহ কিছু এলাকায় নদীভাঙন বেড়ে গেছে। এজন্য আমি সম্প্রতি ওয়াপদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। ভাঙনরোধে সাময়িক কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু এজন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে এ মুহূর্তে ফেনী জেলায় নদীভাঙন প্রতিরোধে কোনো প্রকল্প নেই বলে জানান ফেনী জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী কহিনুর আলম।

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন : হাছান আদনান, বনিক বার্তা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে