বিপন্ন রোহিঙ্গা জাতির পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দাঁড়াতে হবে

0
127

গোলাম সারোয়ার :: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীটির নামে হলো রোহিঙ্গা । মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের এই আদিবাসী নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীটির সম্বন্ধে উক্ত মূল্যায়ন করেছে খোদ জাতিসংঘ । কিন্তু হতাশার বিষয় হলো জাতিসংঘের এই উদ্বেগ শুধু ঐ বলা পর্যন্ত । জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের এই নিষ্ঠুর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর কিছুই করতে পারেনি গত কয়েক দশকে ।

বিশ্বের প্র্রতিটি মানবগোষ্ঠী নানা কার্যকারণের ভিতর দিয়ে কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একসময় একটি জাতি হিসেবে গড়ে উঠে । মানব বিকাশের সেই সুত্রমতে রোহিঙ্গা জাতিরও উত্থান হয়েছে আরাকানে । কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের নেতৃত্ব রোহিঙ্গাদেরকে আরাকানের নাগরিক হিসেবে স্বীকারই করছেনা । কথা হলো, তারা স্বীকার না করলেই ইতিহাস মিথ্যে হয়ে যাবেনা ।

ইতিহাসের সত্য হলো, সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর এই রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙ্গালী, তুর্কি, মোঘল, ফার্সি, পাঠান ও আরবীরা বসতি স্থাপন করে । কালক্রমে এই অঞ্চলে রাখাইন, বর্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব হয়েছে । এভাবে উদ্ভুত এই সংকরজাতি ত্রয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের রাজ্য ছিল।

বর্তমানে রাখাইনে দুটি সম্প্রদায় বসবাস করে । তার একটি হলো মগ অন্যটি হলো রোহিঙ্গা । মগ-রা হলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং রোহিঙ্গা-রা হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বী । বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে প্রায় আট লক্ষের উপরে রোহিঙ্গা বসবাস করে । গত কয়েক দশকে মিয়ানমার সরকারের এবং বেীদ্ধধর্মাবলম্বী চরমপন্থীদের জাতিগত নিপীড়ন এবং নিষ্ঠুর অত্যাচারের কারণে অনেক রোহিঙ্গা স্বদেশ ছেড়ে অনেক দেশে উদ্ধাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে । বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা মুসলমান রয়েছে । সৌদি আরবে রয়েছে প্রায় চার লক্ষের মতো । এছাড়াও পাকিস্তানে প্রায় দুই লক্ষ, থাইল্যান্ডে প্রায় এক লক্ষ, ভারতে প্রায় ছত্তিশ হাজার, মালয়েশিয়াতে প্রায় ছব্বিশ হাজার এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশেও অনেক রোহিঙ্গা ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মিয়ানমারে মূলত আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং. মংডু, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাথরকিল্লা প্রভূতি এলাকায় এদের বসবাস।

বর্তমানে যে অঞ্চলটির নাম রাখাইন সেটার পূর্বে নাম ছিলো আরাকান । আরাকানের রাজসভার বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকরা রাজ্যটিকে বলতো রোসাং কিংবা রোসাঙ্গ । এটি বার্মার একটি প্রদেশ । এর উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, উত্তরে চীন, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ম্যাগওয়ে অঞ্চল, ব্যাগো অঞ্চল এবং আয়েইয়ারওয়াদি অঞ্চল । আরাকান পর্বত রাখাইন প্রদেশকে মূল বার্মা থেকে পৃথক করেছে । আরাকান পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া ভিক্টোরিয়া শৃঙ্গের উচ্চতা ৩,০৬৩ মিটার । রাখাইন রাজ্যের আয়তন ৩৬,৭৬২ বর্গকিলোমিটার এবং এর রাজধানীর নাম সিত্তে ।

ধারণা করা হয় রাখাইন শব্দটি এসেছে পালি শব্দ রাক্ষপুরা থেকে । রাক্ষপুরা থেকে সংস্কৃত রাক্ষসপুরা মানে রাক্ষসদের দেশ। খুব সম্ভবত এই অঞ্চলে বাস করা নেগ্রিটো অধিবাসিদের জন্য এই নাম দেয়া হয়। রাখাইনরা মনে করে রাখাইন শব্দের অর্থ, যে নিজের জাতিসত্ত্বা ধরে রাখে। যেসব রাখাইন বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে বেপরোয়া তাদের পূর্বপুরুষরা আরাকানে বসতি স্থাপন করে একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে । তাহলে প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক এই অঞ্চলের আদিবাসী ভূমিপুত্র আসলে কারা! এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে স্মরণযোগ্য মহাকালের দিকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয় ।

বিজ্ঞানীদের ধারণামতে প্রাইমেট বর্গের অন্তর্গত হোমিনিডি গোত্রের মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিলো আফ্রিকা ও ইথিওপিয়া অঞ্চলে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে । এক লক্ষ পঁচিশ হাজার থেকে ষাট হাজার বছরের ভিতরে সেখান থেকে একটি দল এশিয়া ও ইউরোপে প্রবেশ করে । এদের একটি দল ভারত বর্ষে প্রবেশ করে বিজ্ঞানীরা যাদের বলে থাকে নেগ্রিটো । খ্রীষ্টপূর্ব চল্লিশ থেকে বিশ হাজার বছরের মধ্যে এরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলো । এদের নিদর্শন পাওয়া গেছে পাকিস্তানের সোয়ান উপত্যকায়, ভারতের মাদ্রাজে এবং মুর্শিদাবাদে ।

আফ্রিকা থেকে প্রায় ৬৫ হাজার বছর পূর্বে আরেকটি দল অন্যান্য মহাদেশের দিকে যাত্রা শুরু করে । বিজ্ঞানীরা এদেরকে বলেছেন প্রোটো-অস্ট্রালয়েড। প্রায় ৪০ হাজার বছর পূর্বে এরা সাগর পাড়ী দিয়ে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে প্রবেশ করে । এরা ছিলো অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের সদস্য । ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২০ থেকে ৬ হাজার বছর পূর্বে এরা ভারতবর্ষে আসা শুরু করেছিলো । সেই সময় এই অঞ্চলে এদের অনেক প্রভাব ছিলো  । এদের প্রভাব ম্লান হয়ে যায় দ্রাবিড়দের আগমনে। আরেক মহাজাতি মোঙ্গলরা আসে উত্তরপূর্ব দিক থেকে । আর্যরা ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষে আসে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে । এভাবে বিভিন্ন জাতি পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে । আবার কোন কোন জাতির আবাদ করা ভূমিতে অন্যরা এসে দখল করে গেঁড়ে বসে । এভাবে সৃষ্টি হয়েছে এক একটি সংকর জাতির । তাই পৃথিবীর ভূমির উপর কারো নিরঙ্কুশ আধিপত্য দাবি করার সুযোগ নেই ।

নিকট অতীতের ইতিহাস হলো এই রাখাইন বৌদ্ধদের পূর্বপুরুষদের অনেক আগেই হিন্দু চন্দ্রবংশের রাজারা এই অঞ্চল শাসন করতো । মূলত খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীতে চন্দ্রবংশের শাসন আমলেই অপেক্ষাকৃত শ্যামবর্নের রোহিঙ্গাদের বংগভারতীয় পূর্বপুরুষরা আরাকানে বসবাস শুরু করে। সে সময়ে চন্দ্ররাজাদের সাথে বাংলার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো । তখন আরাকানের রাজধানী ছিলো উজালী । বাংলা সাহিত্যে উজালীকে বলা হয়েছে বৈশালী । চন্দ্রবংশীয় উপাখ্যান রাদ জাতুয়েতে একটি আখ্যান উল্লেখ আছে এরকম যে, চন্দ্রবংশীয় রাজা মহত ইং চন্দ্রের রাজত্ব কালে (৭৮৮-৮১০ খ্রিস্টাব্দ) কয়েকটি বাণিজ্য বহর রামব্রী দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। সে সময়ে আরবরা ব্যবসা ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে আসতো । উক্ত জাহাজটিও ছিলো আরবীয়দের । তখন জাহাজের আরবীয় আরোহীরা তীরে এসে রাজার আশ্রয় প্রার্থনা করলে রাজা তাদের উন্নততর আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আরাকানে বসতি স্থাপন করতে অনুমতি দেন । আরবীয় মুসলমানগণ স্থানীয় রমণীদের বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।এভাবে তারা স্থানীয়দের সাথে মিশে যান । জনশ্রুতি আছে, আরবীয় মুসলমানেরা জাহাজ ডুবলে পরে ভাসতে ভাসতে কূলে এসে রহম’ ‘রহমধ্বনি দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকে। রহমএকটি আরবী শব্দ। রহম মানে দয়া করা। স্থানীয়রা ভাবলো এরা রহম জাতির লোক। রহম শব্দ থেকেই এসেছে রোয়াং-এই বিশ্বাস রোহিঙ্গাদের । এছাড়া আরব ভৌগোলিক জনাব সুলায়মানের ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ সিলসিলাত উত তাওয়ারীখ’- গ্রন্থেও বঙ্গোপসাগরের তীরে রুহমী নামক একটি দেশের কথা উল্লেখ আছে ।

কালক্রমে একাদশ শতাব্দী থেকে আরাকানে বৌদ্ধ বসবাস এবং প্রভাব বাড়তে থাকে । ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে নরমিখলা নামে আরাকানের জনৈক যুবরাজ মাত্র ২৪ বছর বয়সে পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই সময়ে আরাকনের রাজধানী ছিলো লেম্ব্রো নদীর তীরে লংগ্রেত। নরমিখলা সিংহাসনে আরোহণ করেই একজন দেশীয় সামন্তরাজার ভগ্নিকে অপহরণ করে রাজধানী লংগ্রেতে নিয়ে আসে। এর অভিঘাতে আরাকানের সমস্ত সামন্ত রাজা একত্রিত হয়ে বার্মার রাজা মেঙশো আইকে আরাকান দখল করার জন্য অনুরোধ জানান। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মার রাজা ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান আক্রমণ করলে নরমিখলা পালিয়ে তদানিন্তন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। এই সময়ে গৌড় থেকে বাংলা শাসন করতো ইলিয়াস শাহী রাজবংশ ।

জনশ্রুতি হলো, নরমিখলা গৌড়ে এসে সুফী হযরত জাকির রহমতুল্লাহি আলাইহি নামক জনৈক বিখ্যাত কামিল ব্যক্তির দরবার শরীফে আশ্রয় নেন । নরমিখলা সুদীর্ঘ চব্বিশ বছরকাল গৌড়ে অবস্থান করেন এবং ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা ও রাজনীতি নিয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন শাহ মতান্তরে জালালুদ্দিন শাহ সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে বিশ হাজার সৈন্যবাহিনী দিয়ে নরমিখলাকে স্বীয়রাজ্য আরাকান উদ্ধারের জন্যে সাহায্য করেন।

এই সময়ে নরমিখলা নিজের বৌদ্ধনাম বদলিয়ে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ফলে বার্মার ইতিহাসে তিনি মুহাম্মদ সোলায়মান স্থানীয় ভাষায় মংস মোয়ান হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। গৌড়ীয় সৈন্যের সহায়তায় তিনি আরাকান অধিকার করে ম্রাউক-উ নামক এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। আর এ সাথে শুরু হয় বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এক শ্রেষ্ঠ সভ্যতার। এভাবে আরাকান মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে ।

আরাকান অধিকার করার এক বছরের মধ্যে ওয়ালী খান বিদ্রোহ করে নিজেই আরাকান দখল করে নিলে, গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন শাহ সেনাপতি সিন্ধিখানের নেতৃত্বে আবার ত্রিশ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে নরমিখলাকে সাহায্য করেন। সিন্ধি খানের নামে এখনো একটি মসজিদ আছে পাথুরী কিল্লাতে । ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধি খানের সহযোগিতায় সোলায়মান শাহ পিতার রাজধানী লংগ্রেত থেকে ম্রোহং নামক স্থানে স্বীয় প্রতিষ্ঠিত ম্রাউক-উ বংশের রাজধানী স্থানান্তরিত করে । এই সময়ে আরাকান গৌড়ের সুলতানদের কর প্রদান করতো।

বাংলার প্রতি আরাকানের কৃ্তজ্ঞতা ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য। ১৪৩৩ সালে সুলতান জালান উদ্দিন মুহাম্মদ শাহের মৃত্যু হলে সম্রাট নারামেখলার উত্তরাধিকারীরা ১৪৩৭ সালে রামু এবং ১৪৫৯ সালে চট্টগ্রাম  দখল করে নেয়। ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের দখলে ছিল । ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাঝের কিছু কাল বাদ দিলে আরাকান ম্রাউক-উ রাজবংশের শাসনাধীন ছিলো। এ সময়ে প্রায় প্রত্যেক রাজা নিজেদের বৌদ্ধ নামের সাথে একটি মুসলিম নাম ব্যবহার করতো । তারা ফারসীকে সরকারি ভাষা, গৌড়ের মুসলমানদের অনুকরণে মুদ্রা প্রথা প্রবর্তন, মুদ্রার একপিঠে রাজার মুসলিম নাম ও অভিষেক কাল এবং অপরপিঠে মুসলমানদের কালিমা শরীফ আরবী হরফে লেখা ইত্যাদি চালু করেন । রাজার সৈন্যবাহিনীতে অফিসার থেকে সৈনিক পর্যন্ত প্রায় সবাইকে মুসলমানদের মধ্য থেকে ভর্তি করা হতো। মন্ত্রী পরিষদের অধিকাংশই মুসলমান ছিলো। কাজী নিয়োগ করে বিচারকার্য পরিচালিত হতো।

১৭৮৫ সালে বার্মিজ রাজা বোদোপায়া আরাকান দখল করেন । এরপরে ১৭৯৯ সালে পঁয়ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষ বার্মিজদের গ্রেফতার এড়াতে এবং আশ্রয়ের জন্যে আরাকান থেকে নিকটবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসেন । বার্মার শাসকেরা আরাকানের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে এবং একটা বড় অংশকে আরাকান থেকে বিতাড়িত করে মধ্য বার্মায় পাঠায়। যখন ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে তখন যেন এটি ছিল একটি মৃত্যুপূরী।

বোদোপায়া ছিলেন উগ্রপন্থী বৌদ্ধ যিনি মুসলিম সম্পর্কিত সবকিছুই ধ্বংস করার পক্ষে ছিলেন । আরাকানের সৈকত জুড়ে থাকা মসজিদগুলোকে ধ্বংস করে তিনি সেখনে প্যাগোড়া ও বৌদ্ধ আশ্রম গড়ে তোলেন । তার নৃশংস রাজত্বকালে প্রায় দুই লক্ষ আরাকানবাসী পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় পালিয়ে আসেন । প্রায় ৪০-বছর বর্মী শাসনের পরে ১৮২৪ সালে আরাকান ইংরেজ ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। ব্রিটিসরা যখন এই অঞ্চল দখল করে তখন তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করেন। ব্রিটিসদের সেই তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম বাদ পড়ে । ব্রিটিসরা কেন রোহিঙ্গাদেরকে তালিকাভুক্ত করেননি সেই রহস্য এখনও অজানা ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানিরা ব্রিটিস ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ বার্মায় আক্রমণ করেন। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। এই সময়ে বৌদ্ধ রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অগণিত মানুষ নিহত হয় । রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা মানব-মানবী বৌদ্ধ-জাপানী যৌথ অভিযানে প্রাণ হারান। রোহিঙ্গাদের অনেকে তখন উত্তর আরাকান অঞ্চলে পালিয়ে বাঁচেন এবং জীবন বাঁচাতে প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলায় চলে আসেন।

৪-ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা অর্জন করে । স্বাধীন হবার পরেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গণহত্যা ও নৃশংসতা চলতেই থাকে। ১৯৪৮ সালের পর নৃতাত্ত্বিক বিনাশের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে দুই ডজনের বেশি অভিযান চালানো হয় । ১৯৪৭ সালে রোহিঙ্গারা মুজাহিদ পার্টি গঠন করে যেন আরাকানে তারা একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে । রোহিঙ্গাদের জাতিগত জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে যখন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সেই ১৯৬২ সালে । জেনারেল নে উইনের ক্ষমতা দখলের পর রোহিঙ্গাদের মুজাহিদ পার্টি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় । নে উইন দুই দশকে তাদের উপর অনেকগুলো সামরিক অভিযান পরিচালনা করে । তার একটি হলো কিং ড্রাগন অপারেশনযা ১৯৭৮ সালে পরিচালিত হয়। এই সব অভিযানের ফলেই মূলত তারা বাংলাদেশে এবং পাকিস্তানের করাচিতে চলে যায় । প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বার্মা শাসন করছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা বার্মিজ জাতীয়তাবাদ এবং থেরাভেদা বৌদ্ধ ধর্মীয় মতবাদ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকে। এই মতবাদের অনুষারীরা রোহিঙ্গাসহ ক্ষুদ্রজাতিসত্ত্বার  প্রতি নৃশংস ।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত জনপদ এবং বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু । ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ফলে তারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হন । তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন না, জমির মালিক হতে পারেন না এবং দুইটির বেশি সন্তান নিতে পারেন না, চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত, ভোটাধিকার নেই । তাদের উপর বিভিন্ন রকম অন্যায় ও অবৈধ কর চাপিয়ে দেওয়া, তাদের জমি জবর-দখল করা, জোর-পূর্বক উচ্ছেদ করা, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করা এবং বিবাহের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া ইত্যাদি অপরাধ রাষ্ট্র নিজেই করছে। রোহিঙ্গাদের রাস্তার কাজে ও সেনা ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক শ্রমিকের কাজ করতে হয় ।

রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সরকার নির্ভেজাল গণহত্যা পরিচালনা করছে । মিরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধানে গণহত্যাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, ইচ্ছাপ্রনোদিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কোনো নৃ, জাতি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নির্মূল । ড. ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহ্যাগেন তার লেখা Worse than War বইতে পাঁচ ধরণের উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, সেগুলো হচ্ছে, পরিবর্তন, নিবর্তন, বিতাড়ন, জন্মনিরোধ এবং সর্বাংশে নির্মূল। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিলীন করতে উক্ত প্রতিটি প্রক্রিয়া প্রয়োগ করছে ।

সর্বশেষ মিয়ানমার সীমান্তের তিনটি চেকপোস্টে গত ৯ অক্টোবর অস্ত্রধারীদের হামলায় সে দেশের নয়জন পুলিশ নিহত হয়। ওই ঘটনার জন্যে মিয়ানমান সরকার রোহিঙ্গাদের দায়ী করে তাদের উপর নতুন করে অভিযান পরিচালনা করছে । বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতে, চলমান সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। রোহিঙ্গা নিপীড়ন করতে গিয়ে মানবতাবিরোধী যত প্রকার অপরাধ আছে তার সবটাই করছে বলে অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্যে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহবান করছে । মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আগেও পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে । এবারও বাংলাদেশ সরকার বলেছে, যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে পড়েছেন তারাও মানুষ, সুতরাং যতদিন আমরা পারি তাদের রাখবো । কিন্তু বিশ্বসম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ । বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যা হলো ১০৬৩ জন । এই পরিমাণ ঘনত্বের মানে হলো পৃথিবীর সব মানুষকে রাশিয়ার মতো একটি দেশে একত্রিত করলে যে ঘনত্ব হবে তার থেকেও প্রায় পৌনে তিনগুণ বেশি । বাংলাদেশের রয়েছে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, রয়েছে সামাজিক অভিঘাত। এসব দিক বিবেচনা রাখতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে । জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থাকে এই দায়িত্ব নিতে হবে । তাছাড়া রোহিঙ্গারা অনন্তকাল নিজভূমি ছেড়ে পৃথিবীর পথে পথে অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য হতে পারেনা । আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব রয়েছে মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ প্রয়োগের । সভ্য বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের নিজ দেশের জনগণের উপর এরকম অমানবিক আক্রমণ আর ধৃষ্ট্রতা দেখানোর সুযোগ নেই । মিয়ানমান স্বীকার করুক আর নাই করুন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক । তারা হাজার বছর ধরে ঐ অঞ্চলের বাসিন্দা ।

মহামতি গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক। বৌদ্ধদের পঞ্চশীলের প্রথম শীল হল, প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকব এই শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি। মানুষ তো দূরের কথা কোনো কীট-পতঙ্গকেও হত্যা করা যাবে না। বুদ্ধ করণীয় মৈত্রী সূত্রে বলেছেন, যেসব প্রাণী দৃশ্য-অদৃশ্য, দূরে-কাছে বাস করে, যারা জন্ম গ্রহণ করেছে, যারা জন্ম গ্রহণ করেনি, যারা মাতৃগর্ভে অথবা ডিম্বের ভিতরে আছে, সেখান থেকে বহির্গত হবে তারা সবাই সুখী হোক। আরও বলা হয়েছে, মা যেমন তাঁর নিজের জীবন দিয়ে হলেও একমাত্র পুত্রকে রক্ষা করেন, তদ্রুপ সব প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রী পোষণ করবে। মিয়ানমার এবং সে দেশের জনগণ বুদ্ধের বাণীকে মান্য করলে কিছুতেই এমন মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারেনা । মিয়ানমারের এই আচরণ সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধদের জন্য চরম অবমাননার । তাই এই সময়ে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের উচিত মিয়ানমারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলা।

বিশ্বের প্রতিটি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংঘগুলোকে আহবান করবো মিয়ানমারের এই অমানবিক হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে সৌচ্চার হতে । বিশেষ করে বাংলাদেশি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সর্বোচ্চ সাংঘিক সংগঠনকে আহবান করবো মিয়ানমারে এই মানবতা বিরোধী কাণ্ডের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হোক। আন্তর্জতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আছে মিয়ানমারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের । যদি তারা সভ্য বিশ্বের রীতিনীতি মেনে চলতে না পরে, তবে সভ্য বিশ্বের তাদেরকে বয়কট নিশ্চিত করতে হবে। আর মিয়ানমারের শান্তির নোবেল লরিয়েট এখন ক্ষমতায় থেকে এরকম একটি গণহত্যার দায় থেকে কোনক্রমেই বাঁচতে পারেন না । বিশ্বকে এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে । বিশ্বের আন্ত-ধর্মীয়, আন্ত-জাতীয় সহনশীলতা সমুন্নত রাখার জন্যে এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই হবে ।

 

গোলাম সারোয়ার, কলাম লেখক।

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে