রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথার্থ নয় : হুশিয়ার না হলে সামনে ঘোর সঙ্কট

0
120

গোলাম সারোয়ার :: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মনে হয় ইতিহাসের যে কোন সময়ের চেয়ে সরকারের অনুকূলে। সবগুলো বিরোধী দল কার্যত ব্যর্থ । রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চলছে এক ধরণের স্বস্তির স্থিতাবস্থা । অনেকে মনে করতে পারেন যে, স্বাধীনতার পরের প্রথম সরকার বুঝি সবচেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলো! কিন্তু না, উত্তর হলো প্রথম সরকারের অবস্থা ছিলো এই সময়ের চেয়েও অযুত নিযুত গুণে খারাপ । প্রথম সরকারকে লড়তে হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থার সাথে, ভঙ্গুর অর্থনীতি সাথে, ধ্বংসাবৃত অবকাঠামোর সাথে, জাসদ এবং অন্যান্য তুখোড় শক্তিশালী বিরোধী দলের পাহারার সাথে। সে হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশ হলো একটি উদিয়মান অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দেশ । বিশ্বের অর্থনীতির বৌদ্ধারা বলে থাকেন, বর্তমান বাংলাদেশ হলো, ‘অর্থনীতির বিস্ময়!’

দেশের অবস্থা যে শাসক দলের শতভাগ অনুকূলে তা দেখতে পাওয়া যায়, বিনে যুক্তিতে এবং সময়ের বিনে দাবিতে গ্যাসের মূল্য বৃ্দ্ধির ঘোষণার মাধ্যমে । সেরের উপর সোয়া সের হিসেবে গ্যাসের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর হুংকারের ভিতরে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, সরকার এখন সবচেয়ে নিরাপদ এবং প্রতিরোধের উর্ধ্বে অবস্থান করছে। অতি উৎসাহী এবং অপরিণামদর্শী কোন কোন নেতার অন্তরে উদয় হয়ে থাকতে পারে যে, তাঁদের বুঝি আর কখনো জনগণের কাছে আসতে হবেনা ।

না হলে কোন জনবান্ধব সরকার এই ভাবে মানুষের শান্তির আর স্থিতাবস্থার বিপরীতে অবস্থান নিতে পারেনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব হলো পরিষ্কারভাবে শান্তির বিপরীতে অশান্তির উস্কানী প্রদান ।এই উস্কানী খোদ সরকারই দিতে পারছে এই কারণে যে, দেশের সবগুলো বিরোধী দল ইতোমধ্যে মানুষকে একত্রিত করার আর সংগঠিত হওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে ।

কিন্তু সরকারের লোকজন মনে হয় ভুলে গেছেন রাজনীতির পথ কখনোই মসৃণ নয় । ভুলে গেছেন বলেই তাঁরা মানুষকে যে রকম অবমূল্যায়ন করছেন তেমনি অবহেলা করছেন খোদ সরকার প্রধানের নিরাপত্তার ব্যাপারেও! সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকার প্রধান আর রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রপ্রধান । এই পদ্ধতিতে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন দেশটির টিকে থাকার কীলক । দেশের কর্তাব্যক্তিদের অবস্থা আজ এমনতর যে, সেই কীলকের নিরাপত্তারও খবর তারা রাখতে পারছেন না! এই খবর ভয়াবহ !

সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিত্বের নিরাপত্তার এই ঘাটতি, এই অদক্ষতা, এই অব্যবস্থাপনার অপরাধ অমার্জনীয়! তারা যে তাদের দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করছে না তা মানুষ লক্ষ্য রাখছে। দেশবাসী দেখতে পাচ্ছে, একের পর এক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে । মানুষ অবাক হয়ে দেখলো, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের নাটবল্টু খুলে যায় । রানওয়েতে ধাতব বস্তু পড়ে থাকাতে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানকে আকাশে ৩৭ মিনিট চক্কর দিতে হয় । হাঙ্গেরিতে আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনে যাওয়ার পথে তাঁকে বহনকারী বিমানের জরুরী অবতরণ করতে হয় তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আসগাবাদে । এই ঘটনায় সবাই বললো ব্যাপারটি যান্ত্রিক ক্রটিজনিত । পরে যখন সামজিক মাধ্যমে সবাই প্রতিবাদ জানালো তখন বের হলো কারা কারা সন্দেহভাজন । এই ঘটনায় নয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও ঋজু করা হয় ।

আর সর্বশেষ বগুড়ার সান্তাহারে নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করে একজন অর্বাচীন রমণী প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে যান । তিনি প্রধানমন্ত্রীর পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটিও করেন । প্রধানমন্ত্রী তখন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে যান ।

এই ঘটনার বহুবিদ ব্যাখ্যা দেওয়া যায় । সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যা হলো, একজন অতি সাধারণ নারী আবেগের বশবর্তী হয়ে এই কাজ করেছেন । বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত মানুষজন এই দেশে কম নেই । সে জন্যে তারা আবেগে দিশেহারা হয়ে ছুটে যেতেই পারেন । কিন্তু নিরাপত্তা বলয়ের দায়িত্বে যারা থাকবেন তাদের এই ব্যাপারটি খেয়াল রাখতে হবে । আবেগী মানুষকে নিরীক্ষার ভিতরে রেখে সরকার প্রধানের কাছে যেতেও দেওয়া যায় যেহেতু আমাদের প্রধানমন্ত্রী জনগণের ভালোবাসাকে মূল্য দেন । কিন্তু নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের স্মরণে রাখতে হবে, ক্ষমতার শীর্ষ আচমকা নাটক করার কোন জায়গা নয়। এখানে প্রতিটি অনু পরমানু ঘটনা পরিবিক্ষণে রাখতে হবে ।

ভুলে গেলে চলবেনা এদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অ্যাসাইন্টমেন্ট নিয়েছে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। মোসাদকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নিখুঁত হত্যার মেশিন । পৃথিবীর বেশিরভাগ রাজনৈতিক দুর্ঘটনায় মোসাদের সম্পৃক্ততার আভিযোগ আছে । সেই মোসাদের প্রভাবশালী একজন সদস্য হলো মেন্দি এন সাফাদি । ইসরাইলি লিকুদ পার্টির এই নেতার সাথে বাংলাদেশের বিরোধী দলের একজন নেতা আসলাম চৌধুরির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠে গত বছর । ভারতের আগ্রাতে গত বছরের মার্চ মাস নাগাদ তারা গোপন বৌঠক করে । সেই ঘটনা ফাঁশ হয় মে মাসের দিকে । তবে মার্চ মাসের ঘটনা ফাঁশ হলেও সম্ভবত তারা যোগাযোগ করে আসছিলো আরো আগে থেকে ।

মেন্দি সাফাদিরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে অঘটন ঘটতে থাকে ক্রমে ক্রমে । আমরা দেখলাম, বিদেশী নাগরিকদের উপর, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগুরু, ইমাম, সেবায়েত, পীর, মাসায়েখদের উপর, বিজ্ঞান মনস্ক লেখকদের উপর ক্রমান্বয়ে হামলা বাড়তে থাকে। হত্যা করা হতে থাকে সেই সব মানুষদেরকে যাদেরকে হত্যা করলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাভারেজ পাওয়া যেতে পারে । প্রতিটি গুপ্তহত্যার পর আরেক ইসরাইলী নারী রিতা কাৎসের সংস্থা ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স’ স্মরণাতীত ক্ষিপ্রতায় জানিয়ে দিতে লাগলো, এই সব ঘটনার দায় আইএস স্বীকার করেছে । এসব ঘটনার প্লট এমন ছিলো যে, যেন প্রমাণ হয় বাংলাদেশে আইএস আছে । প্রতিটি ঘটনার পর আমেরিকা থেকে বারবার বাংলাদেশে আইএস আছে স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রতিবার আমেরিকা আইএস দমনে বাংলাদেশকে অনেকটা গায়ে পড়ে ‘সাহায্য করতে চায়’ বলে জানাতে ছিলো । বাংলাদেশ প্রতিটি ঘটনা অসম্ভব দ্রুত সময়ে উৎঘাটন করে দেশের সক্ষমতা প্রমাণ করতে লাগলো এবং ষড়যন্ত্রের চেহারা ‍উন্মোচন করতে লাগলো ।

১ জুলাই ২০১৬, রাত ৯টা ২০ মিনিটে গুলশানের হলি আর্টিসান রোস্তোরায় নয় জন হামলাকারী আইএস স্টাইলে সাধারণ মানুষের উপর হামলে পড়ে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে । সারারাত বাংলাদেশের ভাগ্য গুলশানের অন্ধকার আকাশে ঝুলতে থাকে । এদিন আমেরিকা, ইসরাইলের সাইট ইন্টিলিজেন্স, সিএনএন এবং মোসাদের সক্রিয় এজেন্টদের অনেকটা ‘বড় দিনের উৎসব’ লেগে যায় । সাইট ইন্টিলিজেন্স সেই নয়জন হামলাকারীকে আইএসের যোদ্ধা পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের মরার আগেই তাদের মধ্যপ্রাচ্য স্টাইলের রুমালে পরিবেষ্টিত চেহারার ছবি প্রকাশ করতে থাকে বিশ্বব্যাপী আর ঘোষণা করতে থাকে আইএস বাংলাদেশে হামলা করেছে! আমেরিকা বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্যে ‘গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল টাইপে’ আসার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ।

পরদিন সকাল ৭ টা ৪০ মিনিটে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ ওপেন করেন বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী । তাঁরা মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিনিট সময় খরচ করেন । এই সময়েই তাঁরা বুঝিয়ে দেন বিশ্বকে এই হলো বাংলাদেশ! এখানে এই অলি আওলিয়ার বাংলাদেশে, ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর সাড়ে সাত কোটি গাজীর বাংলাদেশে, শাহজালাল শাহপরাণের বাংলাদেশে, মুনি-ঋষির বাংলাদেশে, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীর বাংলাদেশে এগুলো হবেনা । এখানে দাঁড়াতে দেওয়া হবেনা কোন অশরীরী দৈত্য দানবদের । ষড়যন্ত্র ভেসে গেলো প্রমত্তা গণজোয়ারে । মানুষ দেখলো আইএস নামে যাদের মুখ মধ্যপ্রাচ্যের রুমাল মুড়িয়ে সাজানো হয়েছে সবগুলো বাংলাদেশের সলিমুদ্দি আর কলিমুদ্দিদের সমাজ বিচ্যুত ছাওয়াল!

তারপর ইসরাইল আর আমেরিকা বুঝতে পারে, পঁয়তাল্লিশ বছর আগের বাংলাদেশ আর বর্তমানের বাংলাদেশের ব্যবধান সম্ভবত নভোমন্ডল আর ভূমন্ডলের ব্যবধানের সমান হয়ে গেছে । বিশ্বের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রীরা বুঝলো মেঘে মেঘে অনেক বেলাই চলে গেছে । গত কয়েক মাস বাংলাদেশ ভালো আছে । এই ভালো থাকার অর্থ এই নয় যে, ষড়যন্ত্রীরা থেমে গেছে । বরং তারা নতুন কৌশলে নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে এটাই হলো আসল কথা। কিন্তু সরকার কিংবা সরকারের নিরাপত্তা অফিসারদের সে খবর নেই মনে হয় । যে সরকার দাবি করে জনগণের সরকার সে সরকার কোনরূপ যৌক্তিকতার ধার না ধারে, গণশুনানির আয়োজন না গ্যাসের দাম বাড়িয়ে মানুষকে উপেক্ষা করছে । মানুষকে উপেক্ষা করার পরিণাম শুভ হওয়ার নয় । সরকারের লোকজন শুধু যে জনগণকে উপেক্ষা করছে তাই নয়, তাঁরা খোদ প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার ব্যাপারেও উদাসিনতার পরিচয় দিচ্ছে ।

তারা ভুলে যাচ্ছে, রানওয়েতে ধাতব বস্তুর কথা, তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আসগাবাদে জরুরী বিমান অবতরণের কথা । তাঁরা ভুলে গেছেন তারও আগে প্রধানমন্ত্রীকে ১৯ বার হত্যা চেষ্টার কথা । ভারতীয় অর্থশাস্ত্রবিদ কৌটিল্যকে অনেকে বলে থাকেন চাণক্য । চাণক্য প্রায় দুই হাজার তিনশ বছর আগেই বিভিন্ন ধরণের গুপ্তহত্যার কৌশল বলে গেছেন । বর্তমান বাংলাদেশের এই সব আবেগী রমণীরা যে সেসব কৌশলের কোন কোনটির আধুনিক সংস্করণের অংশ নয় তা কে বলবে! মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরের তরুণ একটি রাষ্ট্র অনেক দুর্ঘটনা সহ্য করেছে। ফের যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায় তবে আমরা মহাসঙ্কটে পড়ে যাবো । এই তথ্য সকল দেশপ্রেমিক জনগণকে মাথায় রাখতে হবে । মাথায় রাখতে হবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত জনদের । এই আহবান মানলে রাষ্ট্রের রণকৌশল সক্রিয় থাকবে । না হলে সামনে রাষ্ট্রের জন্যে ঘোর সঙ্কট অপেক্ষা করছে ।

 

গোলাম সারোয়ার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট ।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে