সাঁওতাল : মানব সভ্যতার আজন্ম সংগ্রামী ভূমিপুত্রদের রক্ষা করতে হবে

0
220

গোলাম সারোয়ার :: পৃথিবীর সহজ, সরল এবং সাহসী জাতিদের একটি হলো সাঁওতাল । সাঁওতালদের আরেক নাম মান্দি । তাদের আরো অনেক নাম আছে । যেমন-সান্তাল, হোর, সান্দাল, সন্থাল, সাতার । পৃথিবীর প্রতিটি সমৃদ্ধ জাতির বিশ্বাস মতে তারাই সৃষ্টিতত্ত্বের আদি মানব মানবী থেকে সৃষ্টি হয়েছে । সাঁওতালদেরও এরকম বিশ্বাস আছে । তাদের বিশ্বাস হলো, আদি মানব ও মানবী পিলচু হড়ম ও পিলচু বুড়ির সাত জোড়া সন্তান থেকে তাদের উদ্ভব । এজন্যেই সাঁওতালরা সাতটি গোত্রে বিভক্ত । সাঁওতালী ভাষায় গোত্রগুলোকে বলে পারিস । গোত্রগুলো হলো; হাঁসদাক, সোরেন, টুডু বা হেমবরোম, কিসকু, মুরমু, মারুদি ও বাস্কে । তবে সাতটি গোত্র ছাড়াও পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে আরও পাঁচটি গোত্রের উদ্ভব ঘটে ।

সৃষ্টিতত্ত্বের প্রথম মানব-মানবীর পরেও তাদের বিশ্বাসের সুতো আছে । মহাভারতের কৌরব এবং পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার‌্য । গুরু দ্রোণের ভাবশিষ্য হলেন একলব্য । সাঁওতালরা বিশ্বাস করেন তারা একলব্যের বংশধর । মহাভারতের একলব্য গুরু দ্রোণের কাছে যুদ্ধবিদ্যা শিখতে গিয়েছিলেন । একলব্য ক্ষত্রিয় ছিলেন না বলে আচার‌্য দ্রোণ যুদ্ধবিদ্যা শিখাতে রাজী হলেন না । কিন্তু বালক একলব্য দ্রোণকেই ভাবগুরু মেনে গহীন বনে একমনে যুদ্ধবিদ্যা শিখতে থাকেন । অবস্থা এমন হয় যে দ্রোণের ক্ষত্রিয় শিষ্যদের থেকে একলব্য বড় যোদ্ধা হয়ে যান । এতে তিনি বিব্রত হন । তাছাড়া গুরু দ্রোণ চান পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হোক তাঁর শিষ্য অর্জুন । তাই তিনি একলব্যের কাছে জানতে চান তার গুরু কে । একলব্য দ্রোণকেই গুরু বলে জানালে দ্রোণ তখন গুরুদক্ষিণা হিসেবে একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল দাবি করেন । একলব্য গুরুকে বিনাবাক্যে আঙ্গুল দিয়ে দেন । সেই পুরাণ বিশ্বাস মতে সাঁওতালরা আজো তীর চালনা কালে নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুল ব্যবহার করেন না ।

সাঁওতালদের মধ্যে টোটেম বিশ্বাস প্রচলিত আছে । টোটেম মানে হলো সাধারণ কোন বস্তু, প্রাণী বা গাছ যা একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করে । প্রতিটি গোত্র তাদের পূর্বপুরুষ কিংবা গাছপালা, জীবজন্তু ও পশুপাখী ইত্যাদির নামে পরিচিত । যেমন সোরেন গোত্রের বিশ্বাস তাদের উৎপত্তি হরিণ থেকে । তাই তাদের হরিণের মাংস খাওয়া নিষেধ । আবার হাঁসদাক গোত্রের বিশ্বাস তাদের উদ্ভব ঘটেছে হাঁস থেকে । তাই তারা হাঁস খায় না ।

https://www.noakhalitimes.comপূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলির একটি হলো সাঁওতাল । তাদের প্রধান নিবাস বিহার, রাঢ়বঙ্গ, উড়িষ্যার অরণ্য অঞ্চল এবং ছোটনাগপুর । পরে সরকারের নির্ধারণে তারা যায় সাঁওতাল পরগনায়। বাংলাদেশে তাদের বাসস্থান প্রধানত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলায়। ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় যে পাবনা, যশোর, খুলনা, এমনকি চট্টগ্রাম জেলায়ও সাঁওতালদের বসতি ছিল । ১৯৪১ সালের ব্রিটিশ ভারতের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুসারে সাঁওতালদের সংখ্যা ছিল ৮২৯০২৫ জন যার ভিতরে পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশে সাঁওতাল ছিলো ২৮২৬৮২ জন । ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বাংলাদেশে সাঁওতালদের মোট সংখ্যা ২০২৭৪৪ । ২০০১ সালের জরিপে এদের মোট সংখ্যা জানা যায় নি । বর্তমানে সাঁওতালদের সংখ্যা হতে পারে তিন লক্ষের উপরে ।

সাঁওতালদের প্রধান উপাস্য সূর‌্য । সূর‌্যকে তারা বলে সিং বোঙ্গা । পর্বতকে তারা গ্রামদেবতা মানে । পর্বতকে তারা বলে মারাং বুরু । সাঁওতালরা সর্বপ্রাণবাদী ও প্রকৃতি উপাসক । তাদের ধর্মাচরণে মূর্তিপূজার প্রচলন নেই । সাঁওতালদের লিখিত সাহিত্য নেই । লোকগীতি ও লোককাহিনী সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে । তাদের ভাষা আছে, লেখ্য বর্ণমালা নেই । ধর্ম আছে, কোন আনুশাসনিক ধর্মগ্রন্থ নেই । গীতি এবং সংস্কৃতি তাদের ধর্মের এবং ঐক্যের প্রাণ । সাঁওতালদের এক সঙ্গে দুই স্ত্রী বা স্বামী রাখার বিধান নেই । সাঁওতাল সমাজে প্রাচীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু রয়েছে । পুরুষদের মতো মেয়েরাও কঠোর পরিশ্রম করে এবং কৃষি কাজে তারা অত্যন্ত দক্ষ । আগে সাঁওতালদের মৃতদেহ আগুনে ভস্মীভূত করার প্রথা প্রচলিত ছিল । বর্তমানে তাদের অনেককে কবর দেওয়া হয় । কারণ আগুনে দাহ করা ব্যয়বহুল । খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা গত কয়েক যুগে তারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে ।

সাঁওতালদের চেহারায় ব্যাপক মিল পাওয়া যায় অস্ট্রিক গোষ্ঠির সাথে । এদের মধ্যম গড়নের আকৃতির শরীর, মাথার খুলি লম্বা থেকে মাঝারি, ত্বকের রং গাঢ়, নাক চওড়া ও চ্যাপ্টা, পুরু ঠোঁট এবং কোঁকড়ানো চুল । ভাষাগত পরিচয়ে এরা অস্ট্রো-এশিয়াটিক । কোল ও মুন্ডারি ভাষার সাথে সাঁওতালি ভাষার সাদৃশ্য আছে ।  নৃতাত্ত্বিকদের ধারণা, এরা ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসীদের অন্যতম । এক সময় এরা বাস করতো উত্তর ভারত থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার দ্বীপ পর‌্যন্ত ।

বিজ্ঞানীদের ধারণামতে প্রাইমেট বর্গের অন্তর্গত হোমিনিডি গোত্রের মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিলো আফ্রিকা ও ইথিওপিয়া অঞ্চলে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে । এক লক্ষ পঁচিশ হাজার থেকে ষাট হাজার বছরের ভিতরে সেখান থেকে একটি দল এশিয়া ও ইউরোপে প্রবেশ করে । এদের একটি দল ভারত বর্ষে প্রবেশ করে বিজ্ঞানীরা যাদের বলে থাকে নেগ্রিটো । এরা ছিলো খর্বাকার, গায়ের রং কালো, চুল কোঁকড়ানো, মাথা লম্বাটে এবং নাক চ্যাপ্টা । খ্রিস্টপূর্ব চল্লিশ থেকে বিশ হাজার বছরের মধ্যে এরা ভারত বর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে । এদের নিদর্শন পাওয়া গেছে পাকিস্তানের সোয়ান উপত্যকায়, ভারতের মাদ্রাজে এবং মুর্শিদাবাদে ।

আফ্রিকা থেকে প্রায় ৬৫ হাজার বছর পূর্বে আরেকটি দল অন্যান্য মহাদেশের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলো । বিজ্ঞানীরা এদেরকে বলেছেন প্রোটো-অস্ট্রালয়েড । প্রায় ৪০ হাজার বছর পূর্বে এরা সাগর পাড়ী দিয়ে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে প্রবেশ করে । এরা ছিলো অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের সদস্য । ভারত বর্ষের কোল, ভিল, সাঁওতাল, পুলিন্দ, শবর জনগোষ্ঠী এদের অন্তর্গত । ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২০ থেকে ৬ হাজার বছর পূর্বে এরা বঙ্গদেশে বা ভারত বর্ষে আসা শুরু করেছিলো । এক সময় এই অঞ্চলে এদের অনেক প্রভাব ছিলো । এদের প্রভাব ম্লান হয়ে যায় দ্রাবিড়দের আগমনে । আরেক মহাজাতি মোঙ্গলরা আসে উত্তরপূর্ব দিক থেকে । আর‌্যরা ভারত বর্ষে আসে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে ।

তার মানে সাঁওতালরা যে আর্যদের আগে থেকেই ভারতে আছে সে ব্যাপারে কোনই দ্বিমত নেই। প্রাচীনকাল থেকে সাঁওতালরা এদেশে বসবাস করে আসছে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী দ্বারা নিগৃহীত হয়ে আসছে ।তাই সাঁওতালরা আজও নিজেদেরকে বলে হোড় বা হেড় যার অর্থ মানুষ ।আর ওদের আক্রমণকারী মানুষদেরকে বলে দিকু ।দিকু মানে হলো আক্রমণকারী কিংবা ডাকাত ।ওরা প্রকৃত অর্থেই সহস্র শতাব্দী ধরে নিপীড়িত এক জাতি ।

সাঁওতালরা প্রকৃতির কাছের মানুষ ।তাদের ঘরগুলো ছোট এবং মাটির তৈরি ।ঘরগুলো থাকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন তবে ঘরে জানালা থাকেনা ।পুরুষেরা সকলে হাতে উল্কির ছাপ দেয় । মেয়েরা রূপার অলংকার ব্যবহার করে এবং খোঁপায় ফুল গুঁজতে ভালোবাসে । আদিকাল থেকে কৃষি তাদের প্রধান পেশা । সে জন্যে ভূমির জন্যে জীবন দিতে তাদের কার্পণ্য নেই কোন যুগে । শিকারের ব্যাপারেও তাদের আগ্রহ প্রবল । সাঁওতাল সমাজ পিতৃতান্ত্রিক । সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে পিতা প্রত্যেক মেয়েকে একটি করে গাভী প্রদান করে । সাঁওতাল সমাজে বহিঃগোত্র বিবাহ প্রচলিত । এমনকি উপগোত্রের মধ্যেও বিবাহ হয় না । তাদের সমাজে ছয় প্রকারের বিবাহের রীতি প্রচলিত ছিলো । বর্তমানে তিন ধরনের বিবাহের প্রচলন দেখা যায় ।

কন্যার পিতা-মাতা ও আত্নীয় স্বজনের সম্মতিতে যে বিয়ে হয় তাকে বলে আসলি বিবাহ । সাঁওতালদের প্রত্যেক গ্রামেই হাট বসে । মেয়েরা যখন হাটে যায়, তখন তাদের সাথে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকে । সাঁওতালী ভাষায় তাদেরকে বলে যোগমাঝি । কোন সাঁওতাল মেয়ে যদি কোন ছেলেকে পছন্দ করে তখন সে যুবতী যোগমাঝির কাছে তা প্রকাশ করে । তারপর যোগমাঝি সে যুবককে সব কিছু খুলে বলে । যুবকটি যদি এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন যোগমাঝি ছেলে ও মেয়ের অভিভাবকদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে বিয়ের দিন ধার্য করে । একে বলে রাজারাজি বিবাহ ।

আরেক প্রকারের বিবাহ আছে তাকে বলে হুর কাটারা বিবাহ । কোন যুবক যদি কোন যুবতীকে ভালোবেসে ফেলে এবং সেই যুবতী যদি তাকে অপছন্দ করে ও বিয়েতে অসম্মতি জানায় এক্ষেত্রে যুবক তাকে পাবার জন্য হাটে যায় । সেখানে সে সুযোগ মত যদি যুবতীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারে তাহলে সে যুবতীর অন্যত্র বিয়ে হতে পারে না । গ্রামের মাতব্বরদের মাধ্যমে যুবককে অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয় এবং তা আদায় হলে যুবক যুবতীর বিবাহ কার্য সমাধা করা হয় । এটি হলো হুর কাটারা বিবাহ ।

বিভিন্ন উৎসবে এরা নাচ গানে মেতে ওঠে । প্রকৃতির সাথে এদের রয়েছে নিভীড় সম্পর্ক । সাঁওতালদের বার্ষিক উৎসবের নাম ‘সোহরাই‘ । এই উৎসবে মেয়েরা দলবদ্ধভাবে নাচে । শীতের শেষে যখন বনে ফুল ফোটে তখন এরা করে ‘বাহা‘ উৎসব । আর একটি জনপ্রিয় উৎসবের হলো ‘দাসাই’। এরা নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলে । শিল্পকলার প্রতি এদের রয়েছে প্রগাঢ় আগ্রহ । এরা ঢোল, দোতারা, বাঁশি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে ও বাজায় । ঘরবাড়ির দেয়ালে, হাঁড়ি কলসির গায়ে ছবি আঁকে ।

সাঁওতালরা ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্রোহটি করে ৩০শে জুন ১৮৫৫ সালে । সহজ, সরল, নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় সাঁওতাল আদিবাসিরা সেদিন ভারত বর্ষে জেগে উঠেছিল । জ্বালিয়ে ছিলো প্রতিবাদের দাবানল । সাঁওতাল বিদ্রোহ হয় মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায় । এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানু, চাঁদ এবং ভৈরব প্রমুখ । ১৮৫২ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল । সাঁওতাল বিদ্রোহ হলো ভারতবর্ষে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত বিদ্রোহ । তার পরের মহাবিদ্রোহ হলো সিপাহি বিদ্রোহ ।

https://www.noakhalitimes.comসাঁওতাল বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ সৈন্য ও তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা । সাঁওতাল হুলের ইতিহাস হতে জানা যায় দামিন-ই কোহ ছিল সাঁওতালদের নিজস্ব গ্রাম । তারা বলতো নিজস্ব দেশ । ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে জুন প্রায় ত্রিশ হাজার সাঁওতাল কৃষক বীরভূমের ভগনাডিহি থেকে সমতলভূমির উপর দিয়ে কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে । ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম গণপদযাত্রা । ৭ই জুলাই দিঘি থানার মহেশলাল দারোগাসহ ১৯ জনকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে । বিদ্রোহের নায়ক সিধু ও কানু তাদের ভাষায় ডাক দেন, ‘রাজা-মহারাজাদের খতম করো, নিজেদের শাসন কায়েম কর’ । তাদের ডাকে সাঁওতাল কৃষকরা ছাড়াও কুমার, তেলী, কর্মকার, চামার, ডোম, মোমিন সম্প্রদায়ের গরীব মুসলমান ও গরীব হিন্দু জনসাধারণ বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে । এটিই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম । সাঁওতালরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইংরেজ বাহিনীর হাতি, ঘোড়া, বন্দুক ও কামানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে । এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন । সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা বৃটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল । ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে তা শেষ হয় ।

সিদু-কানুকে ষড়যন্ত্র করে ধরিয়ে দেওয়া এবং হত্যার পরই স্তিমিত হয়ে পড়ে বিদ্রোহ । এই যুদ্ধে আদিবাসী সাঁওতাল নারীরাও সর্বস্ব নিয়ে যুদ্ধে নামে । সিদু-কানুর বোন ফুলমনিও এই যুদ্ধে শহীদ হন । এই ফুলমনিকে নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালদের গান রয়েছে । বিদ্রোহের ফল হিসেবে ভাগলপুর ও বীরভূমের কিছু অংশ নিয়ে ৫,৫০০ বর্গ মাইল জুড়ে এবং প্রথমে দেওঘর ও পরে দুমকায় প্রধান কার্যালয় নির্দিষ্ট করে সাঁওতাল পরগণা গঠন করতে ইংরেজরা বাধ্য হয় । এই পরগণাকে অনিয়ন্ত্রিত বা নন-রেগুলেটেড একটি জেলা ঘোষণা করা হয় । ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করেন । ম্যাজিস্ট্রেট এডন সাঁওতালদের আবেদন শুনেন ।

সাঁওতালরা সহজ সরল তবে লড়াকু জাতি । জীবণ সংগ্রামই তাদের চলার পথের পাথেয় । সিধু, কানুর সাঁওতাল বিদ্রোহের অনেক আগে থেকেই সাঁওতালরা সংগ্রাম করে আসছে । প্রথমত মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই তারা পৃথিবীর পথে পথে সংগ্রাম করেই নিজেদের অস্তিত্ব আজো টিকিয়ে রেখেছে । আর ইংরেজ আমলে তাদের সংগ্রাম মূলত তাদের স্বর্গ তাদের গ্রাম দামিন-কে নিয়ে । বহু কষ্ট করে জঙ্গল কেটে সে বন সাফ করে তারা এই জনপদ গড়ে তুলেছিল । ১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে দেওয়ানী লাভ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি । তারপর বাংলা, বিহার, ওডিশ্যার আদিবাসীদের কষ্টার্জিত জমি বিভিন্ন আইনি জালে জড়িয়ে তারা কেড়ে নিতে শুরু করে । জোতদার-জমিদার, ভূস্বামী, মহাজন এবং কোম্পানির কর্মচারীদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়ে সাঁওতাল রমণীদের উপর । এসব অন্যায়-অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের মধ্যে অস্ত্র হাতে প্রায় গর্জে উঠেছিল সাঁওতাল আদিবাসীরাই।

আদিবাসী সাঁওতালদের বিদ্রোহ শুধু একবার নয়, ঘটেছে বার বার। ১৭৯৭, ১৭৯৮, ১৭৯৯, ১৮০৭, ১৮৩১-১৮৩২, ১৮৫৫-১৮৫৬, ১৮৭৪-১৮৭৫, ১৮৮০-১৮৮১ এবং ১৯০০ সালে । সিধু, কানু-রা যে মহান সাঁওতাল নেতার উত্তাপ থেকে সংগ্রামে প্রণোদিত হয়েছিলো তিনি হলেন ১৭৮০ সালের ভাগলপুরের সাঁওতাল নেতা বাবা তিলকী মুর্মু  । এই মহান সাঁওতাল নেতা তৎকালীন বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলার তিলকপুর গ্রামে ১৭৫০ সালে জন্মগ্রহন করেন । অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ড ভাগলপুরের কালেক্টর নিযুক্ত হয়েছিলেন ১৭৯৯ সালে । রাজমহল পর্বতমালার পাদদেশের ‘দামিন-ই-কোহ্‌’ অঞ্চলটি ইংরেজ আমলের সৃষ্টি। ইংরেজরা সাঁওতালদের লোভ দেখালো এই জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলটি পরিস্কার করে মানব বসতি স্থাপন করতে পারলে সাঁওতালরা এলাকাটি ভোগ করতে পারবে । বলা হয়েছে প্রথম তিন বছর কোনো খাজনা দিতে হবে না, পরে লাগলেও তা হবে যৎসামান্য । এই প্রতিশ্রুতিতে কটক, ধলভূম, মানভূম, বরাভূম, ছোটনাগপুর, পালামো, হাজারিবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম প্রভৃতি এলাকা থেকে সাঁওতালদের এনে দামিনকে জনপদ উপযোগী করা হলো । তারপরে ব্রিটিশরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। জমির উপর ধার‌্য করা হলো উঁচু খাজনা। খাজনা বৃদ্ধি ছাড়াও সাঁওতাল রমণীদের উপর অপদৃষ্টি ! এসব ঘটনায় সাঁওতালরা বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে অন্তর্লোকে । এসব ঘটনা তিলকী মুর্মুকেও বিক্ষুব্ধ করে । তিনি তখন সাঁওতালদের নিয়ে গঠন করলেন ‘মুক্তি বাহিনী’।

জাত নেতা তিলকী মুর্মু নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি আখড়া । সেখানে গ্রামের সমস্ত যুবককে তিনি তীর, টাঙ্গি, তলোয়ার চালানোর শিক্ষা দিতেন । https://www.noakhalitimes.com১৭৮৪ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি অত্যাচারী ক্লিভল্যান্ড ঘোড়ায় চেপে বনের রাস্তা দিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিলেন সে সময় তিলকি মুর্মু বাটুল মেরে ক্লিভল্যান্ডকে মাটিতে ফেলে তার বন্দুক নিয়ে সে বন্দুকের আঘাতেই তাকে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের দায়ে তিলকীকে গ্রেপ্তার করে ভাগলপুরের প্রকাশ্য মাঠে ফাঁসি দিয়েছিল । ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের বিরুদ্ধে লাগাতার এ লড়াই চলে এবং সাঁওতালদের প্রথম শহীদ বাবা তিলকী । তিনিই সিধু, কানুদের আত্মিক নেতা, আন্দোলনের চেতনা । সেই চেতনার পথ ধরে সিধু কানুর ডাকে ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুনের রৌদ্রদগ্ধ উত্তপ্ত দিনে বনজঙ্গল, পাহাড়তলি থেকে পিপীলিকার ন্যায় সাঁওতাল জনজাতির স্রোত এসে মিশে ছিল ভগনাডিহির মাঠে। সাঁওতালরা ব্রিটিশ কামান বন্দুককে পরোয়া না করে পাঁচটি জেলায় স্বাধীন রাজত্ব কায়েম করে এবং প্রায় দেড় বছর এই বিদ্রোহ ধরে রাখে । ভারতবর্ষে, বাংলাদেশের সা‍‌হিত্যে, সংগী‍‌তে জাতীয়তাবাদের অভ্যুদয় হয়নি যখন; জাতীয়তাবাদ, জাতীয় জাগরণ প্রভৃতি কথাগুলিও কেউ উচ্চারণ করেনি যখন, তখন সাঁওতালরাই তা করে দেখিয়েছিলো । তখন সাঁওতাল পরগনায় দুমকা, গোড্ডা, রাজমহল এবং পাকুড় এলাকায় চারটি দামিন ছিল ।

সর্বশেষ সাঁওতাল রক্তের উত্তাপ আমরা দেখলাম গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধায় । এদিন সাঁওতালদের দেড় হাজারের মতো বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের প্রতিবাদে, প্রতিরোধে এবং ভূমিরক্ষায় তিনজন সাঁওতাল জীবন দেন । জীবন দিতে হাতে তীর তুলে নেন সমস্ত সাঁওতাল মানব মানবী । https://www.noakhalitimes.comসাঁওতালরা দাবি করছে, তাদের বাপ-দাদার এসব জমি ১৯৬২ সালে চিনিকলের জন্য ইজারা নিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। সাঁওতাল ও বাঙালিদের কাছ থেকে ইজারা নেওয়া ১৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি দেওয়া হয় চিনিকল কর্তৃপক্ষকে। সেই জমিতে সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রাম ছিল। ইজারার সেই কাগজপত্রও তাদের কাছে আছে। ইজারা নেওয়া জমিতে আখচাষের জন্য গড়ে তোলা হয় সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার। ওই চুক্তির ৫ নম্বর শর্তে উল্লেখ আছে, ইজারা নেওয়া হলেও কখনো যদি আখচাষের কাজে জমি ব্যবহার করা না হয়, তাহলে এসব জমি চিনিকলের কাছ থেকে সরকারের কাছে ফেরত যাবে। পরবর্তী সময়ে সরকার জমি আগের মালিকের কাছে ফেরত দেবে । আর চিনিকল কর্তৃপক্ষের দাবি, ইজারা নয়, এসব জমি সে সময় অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। সাঁওতালরা বলছে, লোকসানের কথা বলে মাঝে ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধও করে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালে এটি আবার চালু করা হয়। অথচ এখন এসব জমিতে মিলের জন্য আখচাষ না করে ধান, তামাক ও শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। কিছু জমি চিনিকল কর্তৃপক্ষ চাষাবাদের জন্য অন্য লোকদের কাছে ইজারাও দিয়েছে। এর মাধ্যমে মিল কর্তৃপক্ষ ইজারার চুক্তি ভঙ্গ করেছে ।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এই ঘটনায় বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটে একটি অতি উচ্চমাত্রার গুরুত্ব আছে । বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত হচ্ছে । প্রতিটি দেশের কায়েমি স্বার্থবাদী আর ভূমিদস্যুরা সংখ্যালঘুদের উপর জাতিগত নিপীড়ন করে ধর্মের নামে । এগুলো এ কারণে করে যে, অত্যাচারে আর নিগৃহে দিশেহারা হয়ে ঐসব সংখ্যালঘু যেন দেশ ত্যাগে বাধ্য হয় । বলা বাহুল্য ধর্মের নামে এগুলো করলেও এগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান ধার্মিকরা জড়িত নয় । বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো করে স্বার্থবাজ ভূমিদস্যুরা । সাঁওতালরা যা করলো তা হলো শক্তির প্রতীক । যখন ব্রিটিস সাম্রাজ্যের সূর‌্য অস্ত যেতনা পুরো বিশ্বে তখনও ব্রিটিসদের বিরুদ্ধে যৎসামান্য সাঁওতাল রুখে দাঁড়ানোর শক্তি দেখাতে পারলো । আর গোবিন্দগঞ্জেও তারা তীর ধনুক নিয়ে প্রতিরোধে দাঁড়ালো । সংখ্যালঘুদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে । যেই ভূমিতে যার দেশ সে কেন দেশ ছেড়ে অন্যদেশে পরবাসী হবে ! বাংলাদেশে হিন্দুরা আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গারাও সাঁওতালদের এই শক্ত চোয়াল আর ক্ষত্রিয়সম বুকের নি:শ্বাস থেকে সাহস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে নিজ ভূমে । পারবে বিশ্বের সব নিপীড়িত নিগৃহিত জাতি জীবন দিয়ে জীবন-মান-ভূমি রক্ষা করার শক্তি অর্জন করতে । এই সাহসী, বৈচিত্রময় আদিবাসী ভূমিপুত্রদের রক্ষা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে আমাদের জন্যে । রক্ষা করতে হবে পৃথিবীর আশা টিকিয়ে রাখার জন্যে ।

 

গোলাম সারোয়ার
কলাম লেখক ।  ২২শে নভেম্বর, ২০১৬

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে