সুফীবাদ ও মরমী দর্শনঃ মনসুর হাল্লাজের আনাল হকের বানী

0
209

গোলাম সারোয়ার (কলাম লেখক) :: মনসুর হাল্লাজ একদা ধ্যানরত অবস্থায় বলেছিলেন, আনাল হক্ক।  এই কথার মানে হলো, আমিই পরম সত্য। এ কারনে তৎকালীন সময়ে এই ধারণা গড়ে উঠে যে, তিনি খোদাত্ব দাবি করছেন। যেহেতু ‘আল-হক্ক’ বা  ‘পরম সত্য” হলো মহান আল্লাহ-তা-আলার ৯৯টি নামের একটি নাম।

‘আনাল হক্ক’ উচ্চারণের কারণে তিনি দীর্ঘ বিচারের সম্মুখীন হন এবং প্রায় এক দশক বাগদাদে কারাবাস করেন।  অবশেষে ৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে মার্চ জনসম্মুক্ষে বিচারকদের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। সুফী সাধনার ইতিহাসে মনসুর হাল্লাজ হলো মরমী প্রেমের শ্রেষ্ঠ শহীদ ।

হাল্লাজ ছিলেন একজন সুফী সাধক এবং কবি। তাঁর পুরো নাম আবুল মুঘীত আল-হুসাইন বিন আল হাল্লাজ। হাল্লাজের জন্ম ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের আল বাইজা নগরীর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত তূর অঞ্চলে। হাল্লাজের পিতা ছিলেন সুতার কারিগর।  ছোট বেলায় হাল্লাজ নিজেও এই পেশায় ছিলেন তাই তাঁর নামের শেষে হাল্লাজ এসেছে।  হাল্লাজ মানে হলো সুতা প্রস্তুতকারী। পরিবার সুত্রে হাল্লাজ ছিলেন সুন্নি মুসলিম । শৈশবে হাল্লাজের পিতা তাঁকে নিয়ে যান আরবদের প্রতিষ্ঠিত টেক্সটাইল নগরী ওয়াসিতে। ওয়াসিতের বেশিরভাগ মানুষ ছিল সুন্নী ও হানবলি সম্প্রদায়ভুক্ত, শিয়ারা ছিল সেখানে সংখ্যালঘু। ওয়াসিতের একটি স্কুলে কোরান পড়ে হাল্লাজ মাত্র বারো বছর বয়সে হাফেজ হন। খুব অল্প বয়স থেকেই হাল্লাজ মরমী আত্মানুসন্ধানের টান অনুভব করেন। তিনি প্রথম যুগে জুনায়েদ বাগদাদী এবং আমর-আল-মাক্কীর শিষ্য ছিলেন কিন্তু পরে দুজনেই তাঁকে পরিত্যাগ করেন। সাহল আল-তাশতারিও হাল্লাজের একজন ওস্তাদ ছিলেন। হাল্লাজের সাধনার তেজে গুরুরাও ম্লান হয়ে যান।

তরুণ বয়সে হাল্লাজ বিয়ে করেন তারপর মক্কায় হজে যান। সেখানে তিনি এক বছর সময় অতিবাহিত করেন-কেবলার দিকে মুখ করে, রোজা-অবস্থায় এবং সম্পূর্ণ নীরবতার সাথে। এরপর তিনি মক্কা নগরী ত্যাগ করেন এবং লম্বা এক সফরে সময় ব্যয় করেন। পথিমধ্যে শিক্ষাদান এবং লেখালেখিতে মজে যান তিনি । অনেক সুফী-সাধক মনে করতেন যে, সাধারন জনগনের কাছে মরমীবাদের নিগুঢ়তত্ত্ব প্রকাশ করা অনুচিত। মানসুর হাল্লাজ কিন্তু তা’ প্রকাশ করেছেন প্রকাশ্যে তাঁর লিখনি আর শিক্ষার ভিতর দিয়ে।  এভাবে উনি অনেক সুফী শত্রু তৈরী করেন।https://www.noakhalitimes.com

বাগদাদে তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা সাধারণ মানুষদের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হয় এবং এই শিক্ষার প্রভাবে সেখানে ক্রমশ সংগঠিত হয় নৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। এতে শিক্ষিত ও শাসক শ্রেণীর মধ্যেও তাঁর অনেক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়। শাসক গোষ্ঠী হাল্লাজের মতবাদে ভীত হন। তাই তারা তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতা ও আব্বাসীয় শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন । ৯০৮ খৃস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফার বিরুদ্ধে সুন্নি সংস্কারকদের ক্ষমতা দখলের ব্যর্থ চেষ্টার পর হাল্লাজকে বাগদাদ নগরী ছেড়ে যেতে হয়। ৯১৩ খৃস্টাব্দে হাল্লাজ আটক হন। এরপর থেকে মৃত্যু অবধি হাল্লাজ বন্দি জীবন যাপন করেন।

কোরানকে তিনি আত্মীকৃত করেন সুফিতাত্ত্বিক ও মরমী উপলব্ধির নিরিখে । এভাবেই শুরু হয় তাঁর ভিতরে সুফি ও মরমী প্রেমের রহস্য অনুসন্ধান। পরমকে কাছে পাওয়ার বিশেষ পথের টান তিনি অনুভব করেন । এরপর হাল্লাজ গুরুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তার সুফি ও মরমী সাধনা চলতে থাকে একাকীত্বের পথ ধরে। একদিন নিগুঢ় তত্ত্বসাধনায় মগ্ন ছিলেন হাল্লাজ। হঠাৎ অদৃশ্য হতে প্রকম্পিত আওয়াজে তাঁর শিহরন জাগে। কিন্তু তিনি কোথাও কাউকে দেখলেন না । তিনি খেয়াল করলেন এ শব্দ বাহিরের কোনো শব্দ নয়—বরং নিজের ভিতর থেকে কে যেন বলছে তাকে—হাল্লাজ! তুমি তোমাকে জানো কি?

নিজেকে জানো, এ কথা সক্রেটিসও বলে গেছেন।  আমাদের বাংলায় বলে গেছেন লালন।  জগতের সব সুফী সত্যের সন্ধান পান।

যা বলছিলাম, হাল্লাজ কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে রইলেন । তারপর খেয়াল করলেন ভিতরের সত্ত্বাটি আর কেউ নন স্বয়ং পরম সত্তা। হাল্লাজ আবার সাধনায় মনোনিবেশ করলেন। এভাবে সাধনায় তিনি সর্বোচ্চ সুফিতাত্ত্বিক স্তরে পৌঁছলেন।  তারপর অনায়াসে বলেন, ‘আনা-আল হক্ক’ মানে ‘আমিই একমাত্র সত্য’। মানসুর হাল্লাজ বিশ্বাস করতেন যে, একমাত্র আল্লাহ -তাআলাই পারেন উনার নিজের একত্বের ঘোষণা দিতে।  অপরপক্ষে  মানুষের ইবাদত শুধুমাত্র তাঁর হুকুমের প্রতিফলন, তাঁর আদেশের সামনে মাথা নত করা। ভালবাসা মানে প্রিয়জনের পাশে দাড়িয়ে থাকা, নিজের আমিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করা আর নিজেকে তাঁর রঙে রাঙিয়ে নেয়া । আল্লাহতে তিনি এতদূর নিমগ্ন হতে পারতেন যে, তিনি অনেক সময় নিজের নামটি পর্যন্ত স্মরণ করতে পারতেন না। মানসুর বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহর সাথে আত্মিক মিলন সম্ভব।  আবার এটাও বিশ্বাস করতেন যে তিনি নিজে তাঁর সঙ্গে এক হয়ে মিলে গেছেন। মৃত্যুদন্ডের পর তাঁকে টুকরো টুকরো করে কাটা হয়, তখন তাঁর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে আওয়াজ আসে, আনাল হক্ক ।

হত্যার পর টুকরো টুকরো করে কাটা অংশ যখন আনাল হকে বানী প্রচার করতে ছিলো তখন আব্বাসীয় খলিফা আল মুকতাদির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। শেষে তাঁর দেহকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর তাঁর দেহভস্ম বাতাসে মিলিয়ে ফেলা হয়। হাল্লাজ সারাজীবন চেয়েছেনও অনন্তের সাথে মিশে যেতে।  এভাবে পরমের সাথে তিনি প্রকাশ্যেই মিলে যান। আল্লাহর সাথে তার মিলিত হবার বাসনার কারণে তৎকালীন বহু মুসলিম একেশ্বরবাদী ইসলামিক পন্ডিত তাঁকে “ছদ্ম-খ্রিস্টান” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

হাল্লাজ শুধু সুফী ছিলেন না।  তিনি ছিলেন একাধারে মরমি সুফী , বৈপ্লবিক, সাহিত্যিক এবং দার্শনিক।  তিনি গদ্য এবং পদ্য আকারে প্রচুর লেখালেখি করেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো কিতাব আল-তাওয়াসিন। এই বইতে দুটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় আছে আল্লাহ-তাআলা এবং ইবলিশ শয়তানের কথোপকথনের ব্যাপারে। যখন ইবলিশ হযরত আদম (আ:) কে সেজদা করতে অস্বীকার করে, অথচ তা ছিলো আল্লাহ তাআলার সরাসরি নির্দেশ। এই ব্যপারে মানসুর হাল্লাজ তাঁর বইয়ে বলেন, তুই যদি খোদাকে নাই চিনতে পারলি, কমপক্ষে তাঁর নিদর্শনকে তো চিনতে পারতি !

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো তিনি নাকি হজ করার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বাস্তবিকপক্ষে উনি নিজেই তিন বার হজ পালন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর কথা ছিলো হজের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে নয়; বরং হজের অন্তর্মর্ম নিয়ে। তাঁর মতবাদের সারমর্ম ছিল, সমগ্র মানবজাতির এক নিগূঢ় অন্তর্দর্শন আছে, যার সাহায্যে  তিনি স্রষ্টাকে অন্তরের অন্তস্থলে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন এবং চেয়েছিলেন যাতে করে অন্যরাও তা খুঁজে পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঐশ্বরিক বাস্তবতায় পৌঁছানোর জন্য গতবাঁধা আনুষ্ঠানিক ধর্মকর্মের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। এমনকি উনার চিন্তার পরিসর ধরাবাঁধা প্রচলিত মুসলিম বিশ্বাসের বহু ঊর্ধ্বে ছিলো, তিনি ছিলেন পুরো মানবতার জন্য উদ্বিগ্ন। আর এই কারনেই তিনি দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করে খোরাসান, তুর্কিস্তান, সিন্ধু, ভারত, চীন প্রভৃতি মুসলিম-অমুসলিম অঞ্চলে তার ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করেন।

হাল্লাজকে জানতে হলে সুফিতত্ত্বকে জানতে হবে। জানতে হবে জগতের তাত্ত্বিকভেদ ও দর্শনকে সবিস্তারে ।

 

গোলাম সারোয়ার

কলাম লেখক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে