সৈয়দ শামসুল হক-বাংলার পরাবাস্তবতার কবি-সব্যসাচী লেখক, চলে গেছেন

0
129

গোলাম সারোয়ার (কলাম লেখক) ::  তাঁর কবিতায় আছে মহাজাগতিক চৌম্বক ক্ষেত্রের টান।  ‘পরানের গহীন ভিতর’ যিনিই পড়বেন কবিতার বলয়ে তিনি আটকা পড়বেন।  তিনি একাধারে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প তথা সাহিত্যের সকল শাখায় দীপ্তপদে হেঁটেছেন। বাংলা সাহিত্যের তিনি ছিলেন অভিভাবক।  তিনি ছিলেন ছোট দেশের বড় কবি।  আমরা কতকটা তাঁকে বুঝেছি, বেশির ভাগই বুঝিনি।

১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুন দম্পতির একটি শিশু জন্ম নেয় বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে। তারপর কালক্রমে শিশুটি হয়ে উঠেন সৈয়দ শামসুল হক। সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাঁকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলে বর্তমানের মানুষেরা। পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। তিনি ডাক্তারি চর্চা করতেন। তিনি আট ভাই-বোনের প্রথম ভাই।

প্রথম পদ্য তিনি লিখেছিলেন এগারো-বারো বছর বয়সে। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কবি তাঁর বাড়ীর রান্নাঘরের পাশে সজনে গাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দুলাইনের একটি পদ লিখেন। পদটি এরকম, আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/ তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে।

তারপর ১৯৪৯ – ৫০ সালের দিকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে ব্যক্তিগত খাতায় ২০০টির মতো কবিতা লিখেন নিভৃতে। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের মে মাসে। ফজলে লোহানী ছিলেন সোনা খোঁজা এক মানব।  তাঁর সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায় সৈয়দ হকের প্রথম লিখাটি প্রকাশিত হয় । সেখানে ‘উদয়াস্ত’নামে তাঁর গল্পটি ছাপা হয়।https://www.noakhalitimes.com

সৈয়দ শামসুল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। পৃথিবীতে কবিতার আর দর্শনের সাথে গণিতের কোন একটি নিগুঢ় সম্বন্ধ আছে হয়তো। সেটা সৈয়দ হকের ভিতরেও দেখা গেছে। ১৯৫০ সালে গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর পিতার ইচ্ছা ছিলো তাকে তিনি ডাক্তারি পড়াবেন। পিতার এরকম দাবির প্রতিকূলে তিনি ১৯৫১ সালে বম্বে পালিয়ে যান। বম্বে  তিনি এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে । তারপর ১৯৫২ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন মানবিক শাখায়। ১৯৫৪ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।

স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সালে সেখান থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেরিয়ে যান পৃথিবীর পথে। তার কিছুদিন পর তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘’দেয়ালের দেশ’’ প্রকাশিত হয়। সৈয়দ শামসুল হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন। তাতাঁর নিষিদ্ধ লোবান অবলম্বনে গেরিলা ছবিটি তৈরি হয়েছে। তিনি লিখেছেন বেশুমার।  পড়েছেন তার চেয়েও ঢের বেশি।  তাঁর প্রবন্ধ হৃৎ কলমের টানে।ছোট গল্প তাস, শীত বিকেল, রক্তগোলাপ, আনন্দের মৃত্যু, প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান, জলেশ্বরীর গল্পগুলো।

তাঁর কবিতা, একদা এক রাজ্যে, বিরতিহীন উৎসব, বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা, প্রতিধ্বনিগণ, অপর পুরুষ, পরাণের গহীন ভিতর, রজ্জুপথে চলেছি, বেজান শহরের জন্য কোরাস, এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি, অগ্নি ও জলের কবিতা, কাননে কাননে তোমারই সন্ধানে, আমি জন্মগ্রহণ করিনি, তোরাপের ভাই, নাভিমূলে ভস্মাধার, ধ্বংস্তূপে কবি ও নগর।

তাঁর উপন্যাস এক মহিলার ছবি, অনুপম দিন, সীমানা ছাড়িয়ে, নীল দংশন,বারো দিনের শিশু, বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল, নিষিদ্ধ লোবান, খেলা রাম খেলে যা, মেঘ ও মেশিন, মহাশূন্যে পরাণ মাষ্টার, আয়না বিবির পালা,পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরুলদীনের সারা জীবন এবং আরো অসংখ্য লিখা তিনি লিখে গেছেন।

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ এই মহামান্য কবির আত্মা ইথারে ভেসে পরলোকে চলে গেছেন। এই সময়টি হচ্ছে বাংলাদেশের কলিজা টান দেওয়ার সময়।  এই সময়ে সোনার মানুষ সব চলে যাচ্ছেন।  আমরা ভয় পাই যেহেতু সময়টি আজো বহমান।  সৈয়দ হকের অভাব কি দিয়ে পূরণ করবে বাংলাদেশ !

 

গোলাম সারোয়ার,
কলাম লেখক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে