১০ ডিসেম্বর বীরশ্রেষ্ঠ মো. রুহুল আমিনের ৪৫ তম শাহাদাত বার্ষিকী

0
121

সোনাইমুড়ি (নোয়াখালী) সংবাদদাতা :: আজ ১০ ডিসেম্বর। বীরশ্রেষ্ঠ মো. রুহুল আমিনের ৪৫ তম শাহাদাত বার্ষিকী। নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আজ দেশের মানুষ স্মরণ করছেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। স্বাধীনতার ৪৫ বছরের মধ্যে এ বীরের নামে নির্মিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মিত হলেও বর্তমানে সেটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। ফলে যে লক্ষ্যে এ বীরের নামাকরণে এসব স্থাপনা করা হয়েছে তা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে ম্লান হয়ে যাওয়ার অভিযোগ স্থানীয় এলাকাবাসী ও স্বজনদের।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলাধীন দেওটি ইউনিয়নের বাগপাঁচড়া গ্রামে রুহুল আমিনের জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের গোটা সময় তিনি জীবন বাজি রেখে লড়েছেন শত্রুদের বিরুদ্ধে। চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ৬ দিন আগে ১০ ডিসেম্বর খুলনার রুপসায় শাহাতাদ বরণ করেন এই বীর যোদ্ধা। এ বীরের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সর্ম্পকে ধারণা দেয়ার জন্য তার জন্মস্থানে ২০০৮ সালে শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা হয়। কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর সেটি আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তার এ বীরত্ব গাঁথা ইতিহাস জানার জন্য তার নামে নির্মিত গ্রন্থাগারে এসে নতুন প্রজন্মরা সামান্য কিছু বই ছাড়া আর কিছুই না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন। জাদুঘরটিও আছে নামেমাত্র। এখানে যুদ্ধের কোনো স্মৃতিও নেই। সরজেমিনে রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, তিন থেকে চার জন শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারটি ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কথা হয় তাদের সঙ্গে। তিনজনই বীরশ্রেষ্ঠ রহুল আমিন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী। আলাপকালে দর্শ নাথীরা জানান, সময় পেলে তারা এখানে আসেন। গ্রন্থাগারে থাকা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বই পড়েন। তবে বইয়ের পাশাপাশি জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের আরো কিছু স্মৃতি বা যুদ্ধে ব্যবহৃত সমরাস্ত্র থাকলে তারা দেখে বুঝতে পারতেন যুদ্ধে কী কী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। জাদুঘরটি নামে মাত্র হওয়াতে অনেকে প্রথম আসলেও হতাশ হয়ে পরে আর আসেনা। তাদের দাবি এটিকে পুনাঙ্গ জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা।

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামেই তার গ্রামের অপর এক ব্যক্তি রুহুল আমিন জানান, বাগপাচড়া গ্রাম থেকে রুহুল আমিন নগর করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। সরকারের কাছে এজন্য তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বীরের নামের এ গ্রামটি এখনো অনেক অবহেলিত। গ্রামের রাস্তাগুলো সংস্কার হয়নি বছরের পর বছর ধরে। বর্তমানে একটি সড়কের সংস্কারের কাজে হাত দিলে তাও পড়ে আছে অনেকদিন ধরে। আগে মানুষজন যেভাবে জাদুঘর দেখার জন্য আসতো এখন অনেক কমে গেছে। তাদের দাবি খুলনার রুপসা নদীর পাড় থেকে রুহুল আমিনের মরদেহ এনে তার গ্রামের বাড়ির সামনে সমাধি করা হোক। তাহলে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসবে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

গ্রন্থাগারের কেয়ারটেকার আলাউদ্দিন জানান, ২০১২ সালের পর থেকে গ্রন্থগারে কোনো বই সরবরাহ করা হয়নি এবং গত তিন বছর ধরে এখানে পত্রিকা সরবরাহ বন্ধ রাখা আছে। উন্নয়নও ঢিলেঢালা। ফলে গ্রন্থাগারে আসা শিক্ষার্থীরা যেমন নতুন নতুন বই ও প্রতিদিনের পত্রিকা পড়তে পারছে না, তেমনি  নামে মাত্র জাদুঘর হওয়াতে দেশের দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে এসে হতাশ হচ্ছেন।

সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ভূইঁয়া জানান, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রামের এলাকা থেকে পড়ালেখা করে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে চাকরি নেন। ছুটিতে বাড়ি আসার পর তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয়ের মাত্র ৬দিন পূর্বে তিনি খুলনার রুপসা নদীর পাড়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাকে সেখানে শায়িত করা হয়। দীর্ঘ দিন পর সরকার তার নামে যে গ্রন্থাগার ও জাদুঘর করে দিয়েছেন বর্তমানে তার যথাযত ব্যবহার না হওয়ায় ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হয়ে থাকবো। এ ব্যাপারে প্রশাসন জরুরীভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান।

এদিকে ২০১২ সালে সড়ক বিভাগের উদ্যোগে বেগমগঞ্জের চৌরাস্থায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামে একটি স্মৃতি স্কয়ার করা হয়। যার উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তুু সেটিও বছরের বেশীর ভাগ থাকে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যানার পোস্টার আর ফেস্টুনে ঢাকা। শুরুতে এটিতে পানির ফোয়ারা থাকলে ও এখন এটি অচল। সৌন্দর্য বর্ধনের অনেক জিনিস নেই। দীর্ঘ দিনেও কোনো সংস্কার না হওয়ায় ধুলো বালিতে এটি বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এনিয়ে ক্ষোভ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতন নাগরিকদের।

বেগমগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল হোসেন বাঙালি বলেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় এ স্মৃতি স্কয়ারের বেহাল অবস্থা। সড়ক বিভাগ এটি তৈরি করে দিলে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চৌমুহনী পৌরসভাকে দেয়া হয়। কিন্তু এর কোনো বিন্দুমাত্র দায়িত্ব পালন করে না। বছরের ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর আসলে কিছু আলোকসজ্জা করা হয়। আর বাকি সময়ে থাকে এটি অরক্ষিত।

সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রবিউল ফয়সল বলেন, ইতিমধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামে স্থাপনাগুলোতে বেশ কিছু সমস্যা তারা চিহ্নিত করেছেন। গ্রন্থাগারে নিয়মিত পত্রিকা ও নতুন নতুন বই সরবরাহ, গ্রন্থাগারের সামনে বাগানের সৌন্দর্যবৃদ্ধির কাজ, গ্রামের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ২৬ বছর আগে নৌবাহিনী কর্তৃক ছোট্র বাড়িটি ভেঙে সেখানে নতুন বাড়ি নির্মাণ করাসহ অনেকগুলো পদক্ষেপ তারা হাতে নিয়েছেন এবং দ্রুত সময়ে এগুলোর বাস্তবায়ন করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে