রাজনীতিতে ত্যাগের মূল্যায়ন হওয়া উচিত সময়, ভূমিকা ও মানুষের পাশে থাকার বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে—শুধু মুখের দাবি কিংবা কারও তেলবাজির মাধ্যমে নয়। কোম্পানীগঞ্জের সরকার দলের রাজনীতিতেও এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, বরং অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা, নেতার দুঃসময়ে অবস্থান এবং বর্তমান কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন।
যারা আজ বিগত সরকারের আমলে নিজেদের ত্যাগী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন, তাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তারা কোথায় ছিলেন? তখন তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কী ছিল? খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন, ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান—এসব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বসুরহাটে তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা স্থানীয় মানুষ কমবেশি জানেন।
কেউ কেউ অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান ও ত্যাগের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়েই কিছু কিছু বিএনপির তেলবাজ লোক নিজেদের ত্যাগী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তাদের কাছে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে ২৪ জুলাইয়ের পরের কর্মকাণ্ড নিয়ে। কারও বিরুদ্ধে যদি সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের বাড়িঘরে হামলা, দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বালুর ব্যবসা কিংবা বাজার-হাট-ঘাট,স্ট্যান্ড ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। তাহলে সেই ত্যাগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া উচিত নয় বলে সাধারণ মানুষ মনে করেন ।
কারণ রাজনীতি মানুষের সেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জায়গা, এটি ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর মাধ্যম হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি রাতারাতি সম্পদের মালিক হন কিংবা প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেন, তাহলে তাকে ত্যাগী বা পরীক্ষিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা দলের জন্যও ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, এমপি ফখরুল ইসলাম’র সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন’র দুঃসময়ে ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলের পাশে থেকেছেন—তাদের বিরুদ্ধে যদি একই ধরনের অভিযোগ না থাকে, তাহলে তাদের অবদানও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেতৃত্বের বিকাশ। যারা নিজেদের ত্যাগী নেতৃত্ব হিসেবে দাবি করেন, তাদের সময়ের রাজনৈতিক হিসাবও নেয়া গুরত্ববহন করে ।
যারা দলের দীর্ঘদিন দায়িত্বে থেকেও দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন কিংবা স্কুল, কলেজ, কয়টি শাখায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে? কেন বছরের পর বছর আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে নেতৃত্ব আটকে রাখা হয়েছে? নতুন নেতৃত্ব তৈরির পরিবর্তে যদি পদ আঁকড়ে থাকার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিএনপির মতো দলই নেতৃত্বের সংকটে পড়বে।
একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু কয়েকজন পরিচিত মুখে নয়, তৃণমূলের হাজারো কর্মী, তরুণ নেতৃত্ব এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যেই দলের ভবিষ্যৎ নিহিত। তাই পুরোনো নেতৃত্বকে অস্বীকার করা হচ্ছেনা কিন্তু নতুন নেতৃত্বের পথও বন্ধ করে রাখা উচিত নয়।
যারা দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তারা ব্যক্তি নয়—দলকে বড় করতে চান। তারা চান যোগ্যতা, সততা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরি হোক। অতীতের ভূমিকা যাচাই করে, বর্তমানের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে এবং ভবিষ্যতের যোগ্যতা দেখে নেতৃত্বের নির্বাচন করা হোক। টাকা দিয়ে কিনে পদ নয়,নেতৃত্বেরগুণাবলী দিয়ে পদ চাই তৃণমূল।
প্রশ্ন হলো—এমপির সঙ্গে যারা দুঃসময়ে ছিলেন, তারা কি ‘ত্যাগী’ পরীক্ষিত’ কিংবা ‘দলের পুরোনো কর্মী’ নন? যারা আজ নিজেদের ত্যাগী হিসেবে দাবি করছেন, তাদের অনেকেই তো একসময় এমপি ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন—তৃণমূলের মধ্যে এমন কথাও রয়েছে। ফলে ত্যাগের তকমা দেওয়ার আগে সবার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা একই মানদণ্ডে যাচাই করা প্রয়োজন।
তৃণমূলের কথা: যারা আজ ত্যাগী দাবী করে তারা দলের জন্য নয়, নিজের জন্য ত্যাগ ছিলো,এমপির দূর্দিনে যারা ছিলো তারা দলেও ত্যাগ ছিলো, ব্যক্তি ফখরুল ইসলাম’র প্রতিও তাদের ত্যাগ ও আনুগত্য ছিল।
দলের প্রয়োজনে এখন সবচেয়ে বেশি দরকার নতুন নেতৃত্বের বিকাশ এবং সবার জন্য সমান রাজনৈতিক সুযোগ। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দল, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণকে সামনে রেখে রাজনীতি করতে পারলেই প্রকৃত ত্যাগের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
পূর্বের ত্যাগের তকমা নয়,নিজেকে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়া ত্যাগ নয়, টাকা দিয়ে পদ নয়,যোগ্যতা দিয় পদ হলো নেতৃৃত্বের গুণাবলির পরিচয়। তৃণমূলের দাবী ২৪ জুলাইয়ের পরবর্তী যারা নিজেদেরকে ত্যাগী দাবী করে অবৈধ সম্পদ’র মালিক হয়েছে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে আর না,পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নতুন যুগান্তকারী নেতৃত্ব।
এএইচএম মান্নান মুন্না
সভাপতি
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব,নোয়াখালী।

