বসুরহাট–মাইজদী রুটে বাস না চলার পেছনে কি উদাসীনতা, নাকি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব!

Date:

নোয়াখালীর বসুরহাট থেকে সোনাপুর হয়ে মাইজদি কোর্ট পর্যন্ত সড়কটি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই পথে প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও নানা প্রয়োজনে যাতায়াতকারী শত শত মানুষ চলাচল করেন। বিশেষ করে মাইজদি যেহেতু নোয়াখালীর প্রধান শহর এবং জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র, তাই এই রুটের গুরুত্ব আরও বেশি। আদালত, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য প্রতিদিন বহু মানুষকে মাইজদিতে যেতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কে এখনো গণপরিবহন হিসেবে নিয়মিত বাস চলাচল চালু হয়নি। ফলে যাত্রীদের ভরসা বলতে কার্যত একমাত্র সিএনজি চালিত অটোরিকশা।

সমস্যা হলো, বিকল্প না থাকলে ভোগান্তিও বেড়ে যায়। বর্তমানে বসুরহাট থেকে মাইজদি কোর্ট পর্যন্ত সিএনজিতে জনপ্রতি ৯০ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। একদিকে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে চিকিৎসা, শিক্ষা ও সংসারের বাড়তি ব্যয়—এর মধ্যে একজন সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য এত টাকা খরচ করা নিঃসন্দেহে বড় কষ্টের। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন আসা-যাওয়া করেন, তাদের মাসিক যাতায়াত ব্যয় অনেক সময় আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

এই অবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। একজন শিক্ষার্থী, যার প্রতিদিন ক্লাসে যেতে হয়; একজন রোগী, যাকে নিয়মিত শহরে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়; একজন চাকরিজীবী, যিনি দৈনিক কর্মস্থলে যাতায়াত করেন—তাদের জন্য এই ভাড়া নিছক সংখ্যা নয়, এটি প্রতিদিনের চাপ, দুশ্চিন্তা এবং বাধ্যতামূলক ব্যয়। গণপরিবহন না থাকায় মানুষ সাশ্রয়ী ভাড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আরও দুঃখের বিষয় হলো, সিএনজিতে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো হাফপাস সুবিধা নেই। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদেরও পূর্ণ ভাড়া গুনেই যাতায়াত করতে হয়। যে বয়সে পড়াশোনার খরচ সামলানোই কঠিন, সেই বয়সে প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয়ও তাদের জন্য আলাদা বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ভাড়ার হিসাবও বলছে, এখানে সাধারণ যাত্রীরা বেশি অর্থ গুনতে বাধ্য হচ্ছেন। বসুরহাট থেকে মাইজদি পর্যন্ত দূরত্ব আনুমানিক ২৭ কিলোমিটার ধরা হলে বর্তমানে সিএনজি ভাড়া দাঁড়ায় প্রায় প্রতি কিলোমিটার ৩.৭৫ টাকা। অথচ একই দূরত্বে বাস চলাচল চালু থাকলে ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত। সরকারি বাসভাড়ার হারে এই রুটে একজন যাত্রীর ভাড়া প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে থাকার কথা। অর্থাৎ বর্তমান ৯০ টাকার জায়গায় ভাড়া প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারত। এই পার্থক্য একজন সাধারণ মানুষের জন্য সামান্য নয়; এটি মাস শেষে বড় আর্থিক বোঝা।

এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—এই রুটে বাস না চলার পেছনে কি শুধু উদাসীনতা, নাকি এর সঙ্গে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাবও জড়িয়ে আছে? স্থানীয়ভাবে অনেকের ধারণা, সিএনজিনির্ভর এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পেছনে একধরনের সিন্ডিকেটসদৃশ বাস্তবতা কাজ করছে। কারণ যেখানে বিকল্প গণপরিবহন নেই, সেখানে যাত্রী বাধ্য; আর যাত্রী বাধ্য হলে ভাড়াও বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত হয় না। এই অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এটুকু স্পষ্ট, বাস না থাকায় একটি একচেটিয়া নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
শুধু ভাড়ার বিষয় নয়, নিরাপত্তার প্রশ্নও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর কবিরহাট–বসুরহাট সড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েকজন প্রাণ হারান। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, ছোট যানের ওপর অতিনির্ভরতা এবং অনিরাপদ সড়কব্যবস্থা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বড় গণপরিবহন থাকে না, তখন ছোট যানবাহনের ওপর চাপ বাড়ে, যাত্রীসংখ্যা বেড়ে যায়, দ্রুত বেশি ট্রিপ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, আর ঝুঁকিও বাড়ে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই সড়ক এখন আর আগের মতো সরু বা অচল নয়। রাস্তা প্রশস্ত, চলাচলের উপযোগী, এবং যাত্রীচাহিদাও যথেষ্ট। মাইজদি যেহেতু জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র, সেহেতু এ রুটে প্রতিদিন বহু ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এ রুটে বাস চালু না হওয়ার কারণ কী? যাত্রী আছে, প্রয়োজন আছে, সড়ক আছে—তবু বাস নেই। এই অস্বাভাবিকতা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে মানুষের মনে সন্দেহ জন্মানো স্বাভাবিক যে, কোথাও না কোথাও জনস্বার্থের চেয়ে অন্য কোনো স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

একটি ব্যস্ত আঞ্চলিক সড়কে গণপরিবহন না থাকা মানে শুধু বেশি ভাড়া নয়; এর মানে হলো সাধারণ মানুষকে একটি ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিকল্পহীন ব্যবস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া। বসুরহাট থেকে সোনাপুর হয়ে মাইজদি কোর্ট পর্যন্ত যাত্রীরা এখন ঠিক সেই বাস্তবতার মধ্যেই বাস করছেন। তারা অতিরিক্ত ভাড়া দিচ্ছেন, নিরাপত্তাঝুঁকি নিচ্ছেন, কিন্তু বিনিময়ে পাচ্ছেন না একটি ন্যূনতম সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা।
এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ। স্থানীয় প্রশাসন, বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিদের উচিত এই রুটে বাস বা মিনিবাস সার্ভিস চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। একই সঙ্গে যাত্রীভাড়া, রুট ব্যবস্থাপনা, স্টপেজ, নিরাপত্তা এবং সিএনজিনির্ভর একচেটিয়া অবস্থার অভিযোগও খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষভাবে নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য জনাব ফখরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি। কারণ এটি কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট একটি জরুরি বিষয়। উন্নয়ন শুধু সড়ক নির্মাণে নয়; সেই সড়কে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করাতেই উন্নয়নের প্রকৃত মানে।
বসুরহাট থেকে সোনাপুর হয়ে মাইজদি কোর্ট পর্যন্ত সড়কের মানুষ আজ খুব বেশি কিছু চাইছে না। তারা শুধু একটি যৌক্তিক দাবিই তুলছে—এই রুটে বাস চালু হোক, ভাড়া কমুক, শিক্ষার্থীদের জন্য হাফপাস চালু হোক, এবং নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত হোক। সাধারণ মানুষের এই দাবি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
লেখক: আফনান মেহমুদ তান্নুর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

কোম্পানীগঞ্জে কৃষকের মাঝে আউশের বীজ ও সার বিতরণ

কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি :: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় কৃষি প্রণোদনা...

কোম্পানীগঞ্জে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাত্রদলের পরীক্ষা উপকরণ বিতরণ

কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি :: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরহাজারী ইউনিয়ন...

কোম্পানীগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন

কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি :: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত...

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির প্রাণের উৎসব ও আত্মপরিচয়ের দীপ্তি!

পহেলা বৈশাখ—একটি দিনের নাম নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের এক...