কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এক বছরের কর্মজীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবাইয়া বিনতে কাশেম। নিজের বিদায়ী বার্তায় তিনি দাবি করেছেন, দায়িত্ব পালনকালে সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ভূমি অফিসকে দালাল ও ঘুষমুক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
এসিল্যান্ড কোম্পানীগঞ্জ ফেসবুক পেজে দেওয়া ওই বিদায়ী বার্তায় রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে কোনো মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা ছাড়াই সরাসরি ভূমিসেবা নিতে পারেন, সে লক্ষ্যেই তিনি কাজ করেছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ভূমি অফিসের সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের দূরত্ব কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি। অফিসের বিভিন্ন স্থানে নোটিশ টানিয়ে অবৈধ লেনদেন থেকে বিরত থাকতে সেবাগ্রহীতাদের সচেতন করা এবং দালালদের মধ্যস্থতা বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
বিদায়ী বার্তায় তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে কয়েক হাজার নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। নিষ্পত্তির সময় বিবেচনায় প্রায় প্রতি মাসেই নোয়াখালী জেলায় তাঁর অবস্থান তৃতীয় বা চতুর্থ ছিল। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে ২১ থেকে ৫৪টি পর্যন্ত নামজারি বা জমা খারিজ মামলার শুনানি করেছেন বলেও জানান তিনি। সরকার নির্ধারিত ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
মিস কেস ও রিভিউ মামলার বিষয়ে রুবাইয়া বিনতে কাশেম জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে করা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০টি মিস কেস ও রিভিউ আবেদনের শুনানি করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬২টি মিস কেস চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। প্রচলিত নিয়মে সপ্তাহে একদিন মিস কেস শুনানির সুযোগ থাকলেও তিনি প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে ছয়টি মামলার শুনানি করার চেষ্টা করেছেন এবং নিজ হাতে রায় লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন।
দালালমুক্ত ভূমি অফিস গড়ার প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ১৭০ টাকা ফি দিয়ে সাধারণ মানুষ যেন নিজেরাই নামজারি করতে পারেন, সেটিই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। শুনানির সময় সেবাগ্রহীতাদের কাউকে কোনো টাকা না দেওয়ার পরামর্শ দিতেন বলেও জানান তিনি। নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত কোনো খরচ নেই—এ বিষয়েও সেবাগ্রহীতাদের জানানো হতো।
দালালদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় কয়েকজন দালাল পরবর্তী সময়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে দালাল ও ঘুষমুক্ত ভূমি অফিস ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও জানান রুবাইয়া বিনতে কাশেম। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগসহ নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও তিনি বিষয়গুলো আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
কর্মঘণ্টার বাইরেও সেবা দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই অফিসে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেক দিন সন্ধ্যা ৬টা, ৭টা এমনকি রাত ৮টা পর্যন্ত সেবাগ্রহীতাদের সেবা দিয়েছেন। পাশাপাশি গত এক বছরে প্রায় ২০০টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছেন বলেও জানান।
এসব অভিযানের মধ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন, ড্রাম ট্রাক চলাচল, ভেজাল খাদ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা, মাটির উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কাটা, বাজার মনিটরিং ও মাদকবিরোধী অভিযান উল্লেখযোগ্য। অফিস সময়ে সাধারণ মানুষ যাতে ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে কারণে অনেক সময় বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন বলে জানান তিনি।
দাপ্তরিক দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দিবস, উপজেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠান, অভিভাবক সমাবেশ, কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিতরণসহ বিভিন্ন ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্বও পালন করেছেন রুবাইয়া বিনতে কাশেম। চর বালুয়ায় লাশ উত্তোলন, নদীতে মৎস্য অভিযান, ভূমিহীন যাচাই-বাছাই, সরেজমিনে দখল পরিদর্শন, মব নিয়ন্ত্রণ, পূজার দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংঘাত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও কাজ করেছেন বলে জানান তিনি।
জাতীয় নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৭০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র পরিদর্শন এবং নির্বাচনের দিন চর এলাহী ও চর ফকিরাতে ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালনের কথাও বিদায়ী বার্তায় উল্লেখ করেন তিনি।
কোম্পানীগঞ্জবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, প্রবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে যে সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন, তা তাঁর কাছে অকল্পনীয়। স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্যের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভালো ও সৎ কাজে সংসদ সদস্যের সমর্থন ছিল এবং সেই সমর্থন না পেলে সততার সঙ্গে কাজ করা কঠিন হতো। দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করায় কোম্পানীগঞ্জের পরপর দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান বিদায়ী এই কর্মকর্তা।
বিদায়ী বার্তার শেষাংশে কোম্পানীগঞ্জবাসীর কাছে ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য দোয়া চেয়েছেন রুবাইয়া বিনতে কাশেম। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত যেসব অনুরোধ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে, তা করার চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি। সময়ের স্বল্পতা কিংবা নীতিবহির্ভূত হওয়ায় যেসব অনুরোধ রাখতে পারেননি, সেজন্য দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।

