সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল একজন জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আমাদের এলাকার আগামী দিনের নেতৃত্ব, উন্নয়ন, সুশাসন ও জনস্বার্থের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সুযোগ। দলীয় মনোনয়নের বাইরে যখন ভোটারের সামনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা, চরিত্র, অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততাই প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তখন সিদ্ধান্তও হতে হবে বিবেক, তথ্য ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে—কোনো প্রলোভন, ভয়, গুজব কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের প্রভাবে নয়।
স্থানীয় সরকার মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সনদ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জনপ্রতিনিধির সিদ্ধান্ত, দক্ষতা ও সততার ওপর নির্ভর করে। তাই ভোটের সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার প্রভাব শুধু নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ওপর দীর্ঘদিন প্রতিফলিত হয়।
দুর্নীতিবাজকে বলুন—না। ঘুষখোরকে বলুন—না। চাঁদাবাজ, দখলবাজ, সন্ত্রাসী ও জনস্বার্থবিরোধী ব্যক্তিকে বলুন—না। যে ব্যক্তি ক্ষমতাকে জনগণের সেবা করার দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত সম্পদ, প্রভাব ও সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তার হাতে জনগণের আমানত তুলে দেওয়া মানে নিজের অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
ভোটের আগে প্রার্থীর পোস্টার, প্রচারণা বা বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড, আর্থিক স্বচ্ছতা, সামাজিক আচরণ, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দায়িত্ব পালনের রেকর্ড যাচাই করুন। তিনি সংকটে মানুষের পাশে ছিলেন কি না, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক ছিলেন, আইন ও নৈতিকতার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আছে কি না, সাধারণ মানুষের কথা শোনার মানসিকতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখুন। প্রার্থীর বক্তব্যের চেয়ে তাঁর কাজ, প্রচারের চেয়ে তাঁর চরিত্র এবং প্রতিশ্রুতির চেয়ে তাঁর বাস্তব অবদানকে বেশি গুরুত্ব দিন।
কেউ যদি টাকা, উপহার বা সাময়িক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে, মনে রাখবেন;এটি অনুগ্রহ নয়; অনেক সময় এটি আপনার ভোট ও ভবিষ্যৎ অধিকার কেনার একটি কৌশল। আপনি কোনো প্রলোভন গ্রহণ করবেন কি না, সেটি আপনার ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয় হতে পারে; কিন্তু আপনার ভোট আপনার পবিত্র নাগরিক অধিকার। কোনো অর্থ, উপহার, ভয় বা চাপের বিনিময়ে সেই অধিকার বিক্রি করবেন না। নির্বাচনের আগে পাওয়া সামান্য সুবিধার মূল্য জনগণকে অনেক সময় নির্বাচনের পর বছরের পর বছর দুর্বল সেবা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দিতে হয়।
সব প্রার্থী হয়তো শতভাগ নিখুঁত নন। তাই বাস্তবতার আলোকে তুলনামূলকভাবে যোগ্য, সৎ, দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব প্রার্থীকে বেছে নিতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা, গোষ্ঠীগত পরিচয়, ধর্মীয় বা সামাজিক বিভাজন, গুজব কিংবা অন্ধ সমর্থনের বদলে প্রার্থীর যোগ্যতা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিন। দলীয় মনোনয়ন না থাকায় এবার ভোটারের দায়িত্ব আরও বেশি; কারণ এই নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাই সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত।
দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও জনবিরোধী ব্যক্তিদের ভোট দেবেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সৎ, যোগ্য ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করুন। কোনো প্রার্থী সম্পূর্ণ নিখুঁত না হলেও তুলনামূলকভাবে ভালো, সৎ ও জনকল্যাণে প্রতিশ্রুতিশীল মানুষকে ভোট দিন। কেউ টাকা দিলে আপনার বিবেকের সিদ্ধান্ত আপনার; কিন্তু ভোট দিন এমন প্রার্থীকে, যিনি জনগণের অধিকার রক্ষা করবেন, উন্নয়নকে স্বচ্ছ রাখবেন এবং ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করবেন না।
মনে রাখবেন, একটি ভোট কেবল একটি দিনের সিদ্ধান্ত নয়; এটি আগামী কয়েক বছরের প্রশাসন, উন্নয়ন ও নাগরিক জীবনের মান নির্ধারণ করে। আপনার ভোটের মাধ্যমে আপনি শুধু একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেন না; আপনি একটি মূল্যবোধ, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং একটি ভবিষ্যৎকে সমর্থন করেন। সৎ মানুষকে ভোট দিলে সৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনা বাড়ে, আর অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দিলে দুর্নীতি ও অনিয়মের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী হয়।
ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়, প্রতিশ্রুতির চেয়ে কর্ম বড়, পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা বড়, দলের চেয়ে জনগণ বড়, আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশ ও জনস্বার্থ। গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন ভোটার সচেতনভাবে তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে জবাবদিহি দাবি করেন। তাই ভোট দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনের পরও জনপ্রতিনিধির কাজ পর্যবেক্ষণ করুন, অনিয়মের প্রতিবাদ করুন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সক্রিয় থাকুন।
আসুন, বিভেদ নয়—ঐক্য গড়ি। প্রলোভন নয়;বিবেককে জাগ্রত করি। গুজব নয়;তথ্য যাচাই করি। ব্যক্তিস্বার্থ নয়;জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিই। দুর্নীতি নয়;সততা ও জবাবদিহিকে বেছে নিই। চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব নয়;আইনের শাসন ও জনসেবার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করি।
এবারের ভোট হোক পরিবর্তনের অঙ্গীকার;অসৎকে প্রত্যাখ্যান, সৎকে সমর্থন; অযোগ্যকে বাদ দিয়ে যোগ্যকে নির্বাচিত করা; ব্যক্তিগত লাভের পরিবর্তে সামষ্টিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া; এবং জনগণের অর্থ, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ একটি সৎ ভোট হয়তো একদিনে সমাজ বদলে দেবে না, কিন্তু অসৎ নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করার ধারাবাহিকতা একদিন অবশ্যই সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণভিত্তিক একটি সমাজের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলবে।
মোহাম্মদ উল্যা মিরাজ
শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক।

