সকল দেশে যেখানে অগ্রগতি, বাংলাদেশে কেন বাড়ে অবনতি?”—প্রশ্নটি কঠিন, কিন্তু অস্বস্তিকর হলেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতাকে আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি ও তথ্যের আলোকে দেখতে হবে। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, অর্থনীতি ও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পরিবর্তনের এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের শহর, বাজার, সড়ক, ফুটপাত, খাল-নালা ও জনপরিসরের একটি বড় অংশ এখনো অপরিচ্ছন্ন, দখলদারিত্বপূর্ণ ও অপরিকল্পিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—শুধু উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কি একটি দেশ সত্যিকার অর্থে উন্নত ও আধুনিক হয়ে ওঠে?
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার কিংবা আধুনিক স্থাপনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য, নাগরিক শৃঙ্খলা, আইন মানার সংস্কৃতি এবং জনপরিসরের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। যে দেশের রাস্তাঘাট উন্নত, কিন্তু রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ; যে শহরে আধুনিক ভবন আছে, কিন্তু ড্রেন ও খাল বর্জ্যে ভরা; যে নগরে যান চলাচলের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, অথচ ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যায় না—সেই উন্নয়নকে নিঃসন্দেহে অসম্পূর্ণ উন্নয়ন বলতে হয়।
আমাদের পরিচ্ছন্নতার সংকট আসলে শুধু ময়লা-আবর্জনার সংকট নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে নাগরিক মানসিকতা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। রাস্তার পাশে ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও তার বাইরে বর্জ্য ফেলা, খাল-নালায় প্লাস্টিক ও পলিথিন নিক্ষেপ করা, যেখানে-সেখানে থুতু ফেলা, নির্মাণসামগ্রী সড়ক দখল করে রাখা কিংবা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা—এসব আচরণ শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক ও নাগরিক সংস্কৃতিরও আয়না।
তবে নাগরিককে দায়ী করে প্রশাসনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পর্যাপ্ত ও কার্যকর ডাস্টবিন স্থাপন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেন ও খাল রক্ষণাবেক্ষণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। নাগরিক যদি ময়লা ফেলে, প্রশাসনের দায়িত্ব সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামো তৈরি করা। আবার প্রশাসন যদি কাঠামো তৈরি করে, নাগরিকের দায়িত্ব তা যথাযথভাবে ব্যবহার করা। এক পক্ষের ব্যর্থতায় অন্য পক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
পরিচ্ছন্নতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও মানবিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জমে থাকা পানি, নোংরা ড্রেন ও দূষিত পরিবেশ রোগজীবাণুর বিস্তার এবং মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগর ও বাজার এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট করে না; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একদিকে আমরা আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করছি, চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছি; অন্যদিকে যদি আমাদের চারপাশের পরিবেশই অসুস্থতা তৈরির অনুকূল হয়ে থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই—এ প্রশ্ন করতেই হয়।
তবে বাংলাদেশকে কেবল “অপরিচ্ছন্ন দেশ” হিসেবে চিহ্নিত করাও বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন নয়। এ দেশে উন্নয়ন হয়েছে, মানুষের সচেতনতা বেড়েছে, বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক উদ্যোগও তৈরি হয়েছে। সমস্যা হলো—অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে নাগরিক শৃঙ্খলা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রে সমানতালে এগোয়নি। আমরা আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করছি, কিন্তু পুরোনো কিছু অভ্যাস ত্যাগ করতে পারছি না। আমরা নতুন সড়ক নির্মাণ করছি, কিন্তু সেই সড়কের পাশে বর্জ্য ফেলছি। আমরা দ্রুত নগরায়ণ করছি, কিন্তু জলাধার, খাল, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনপরিসর রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
এখানেই বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি অন্তর্নিহিত সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উন্নয়ন যদি শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু মানুষের আচরণ, নাগরিক শৃঙ্খলা, পরিবেশ সচেতনতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধে পরিবর্তন না আসে, তাহলে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় তার নাগরিকরা কতটা দায়িত্বশীল, জনসম্পদকে কতটা সম্মান করে এবং নিজের অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে কতটা ভারসাম্য বজায় রাখে—তার মধ্য দিয়ে।
পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব তাই কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা শ্রেণির নয়। নাগরিককে নিজের ঘর পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নিজের আশপাশ, রাস্তা ও জনপরিসরকেও নিজের সম্পদ হিসেবে ভাবতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকে দখলদারিত্ব, অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলা ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দল-মত-পরিচয় নির্বিশেষে নিয়মিত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, নাগরিক শিষ্টাচার, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধকে বাস্তব অনুশীলনের অংশ করতে হবে। গণমাধ্যমকেও শুধু সংবাদ প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সমালোচনা, জনসচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ভূমিকা পালন করতে হবে।
শুধু বিশেষ দিবসে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে কিংবা ছবি তুলে প্রচার করলেই স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন নিয়মিত কার্যক্রম এবং পরিচ্ছন্নতার একটি সামাজিক সংস্কৃতি। বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শহরে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার, খাল-নালা সংরক্ষণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পরিবেশবিধি কার্যকর করার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। আইন থাকতে হবে, তবে আইনের প্রয়োগও হতে হবে নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক। কারণ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যদি ব্যক্তির পরিচয়, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তাহলে নাগরিকের মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি শুরু হতে হবে নিজের কাছ থেকে। আমরা প্রায়ই অপরিচ্ছন্নতার জন্য সরকার, প্রশাসন, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনকে দায়ী করি; কিন্তু নিজের হাতে রাস্তায় ফেলা একটি পলিথিন, ড্রেনে ছুড়ে দেওয়া একটি প্লাস্টিকের বোতল কিংবা ফুটপাত দখল করে রাখা একটি দোকান যে বৃহত্তর সমস্যার অংশ—তা ভুলে যাই। একটি দেশকে অপরিচ্ছন্ন করার জন্য বড় কোনো ষড়যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না; কোটি মানুষের ছোট ছোট দায়িত্বহীন আচরণই ধীরে ধীরে একটি জাতির পরিবেশ ও নাগরিক সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে।
বাংলাদেশ অপরিচ্ছন্নই থাকবে—এটি কোনো অনিবার্য সত্য নয়। আমাদের উন্নয়নের সক্ষমতা আছে, মানুষের সচেতনতা তৈরির সুযোগ আছে, প্রশাসনিক কাঠামো আছে এবং প্রয়োজনীয় আইনও রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর প্রয়োগ এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আচরণগত পরিবর্তন। উন্নত অবকাঠামোর সঙ্গে যদি উন্নত নাগরিক সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটানো যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, পরিবেশগত ও সামাজিক দিক থেকেও আরও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
তাই এখন সময় অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকানোর। শুধু রাস্তা পরিষ্কার করলেই হবে না, রাস্তা নোংরা করার মানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে। শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না, ড্রেনে ময়লা ফেলার অভ্যাসও বন্ধ করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও তৈরি করতে হবে। শুধু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, সেই উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক শৃঙ্খলাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আজকের অঙ্গীকার তাই হতে পারে—ময়লা নয়, দায়িত্ব ছড়াব; দখল নয়, শৃঙ্খলা গড়ব; অভিযোগের আগে নিজের আচরণ বদলাব।
কারণ দেশ শুধু সরকারের নয়, নাগরিকেরও। রাস্তা শুধু চলাচলের জন্য নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত সম্পদ। খাল শুধু পানির প্রবাহের জন্য নয়, এটি পরিবেশের প্রাণ। ফুটপাত শুধু পথচারীর চলাচলের জায়গা নয়, এটি নাগরিক অধিকারের অংশ। আর পরিচ্ছন্নতা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়—এটি একটি সুস্থ, সচেতন, শৃঙ্খলিত ও মানবিক জাতির পরিচয়।
দেশ আমার, দায়িত্বও আমার। পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ—আমাদের সবার অঙ্গীকার।
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার অবকাঠামো যেমন আধুনিক হয়, তেমনি তার নাগরিক আচরণও হয় দায়িত্বশীল। তাই প্রশ্ন শুধু“বাংলাদেশ কতটা উন্নত?” নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমরা কতটা উন্নত নাগরিক?”
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
মোহাম্মদ উল্যা মিরাজ
শিক্ষক,সাংবাদিক ও গবেষক

