জলাবদ্ধতায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, হাসপাতালে যেতে না পেরে ঘরেই সন্তানসহ মারা গেলেন প্রসূতি

Date:

নোয়াখালী প্রতিনিধি:

নোয়াখালীর হাতিয়ায় জলাবদ্ধতা ও ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি এক প্রসূতি মাকে। চিকিৎসার অভাবে ঘরেই সন্তানসহ মারা গেছেন নাজমা আক্তার (৩০) নামে এক প্রসূতি।

বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর গ্রামে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে। নিহত নাজমা আক্তার ওই গ্রামের মো. হক সাবের স্ত্রী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, অস্বাভাবিক জোয়ার এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় নিঝুমদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে। গত দুই দিনে কিছু এলাকায় পানি কমলেও বুধবার দুপুরে অতিরিক্ত জোয়ারে ইসলামপুর গ্রামের বিভিন্ন সড়ক, কাঁচা রাস্তা ও চলাচলের পথ আবারও পানিতে তলিয়ে যায়। এতে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় বুধবার সকালে নাজমা আক্তারের প্রসববেদনা শুরু হলে স্বজনরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চারপাশে পানি জমে থাকায় কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। বিকল্পভাবে নৌকায় নেওয়ারও উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাকে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় প্রসব যন্ত্রণার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে একপর্যায়ে ঘরেই অনাগত সন্তানসহ তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে নিঝুমদ্বীপে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ইউপি সদস্য কেফায়েত হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জোয়ারের পানি ও জলাবদ্ধতায় নিঝুমদ্বীপের নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক এলাকায় সড়ক পানির নিচে থাকায় জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। নাজমা আক্তারের মৃত্যু সেই দুর্ভোগেরই করুণ উদাহরণ। আমরা এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না।

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক বেলাল উদ্দিন বলেন, নিঝুমদ্বীপে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও এখানকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কার্যত জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে একটি স্বাভাবিক (নরমাল) প্রসবসেবা কেন্দ্র এবং তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে প্রসূতি মা, শিশু, বৃদ্ধ ও জরুরি রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

তিনি আরও বলেন, কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হয়। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, জোয়ার-ভাটা, জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটের কারণে অনেক সময় রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। নাজমা আক্তারের মৃত্যু এ অঞ্চলের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও যোগাযোগ সংকটের একটি নির্মম উদাহরণ। অবিলম্বে নিঝুমদ্বীপে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ২৪ ঘণ্টা মাতৃসেবা এবং জরুরি রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা চালু করা না হলে ভবিষ্যতে আরও এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লাভলী আক্তার বলেন, নাজমা আক্তারের আগে দুটি সন্তান রয়েছে। এটি ছিল তার তৃতীয় সন্তান। চারপাশে জোয়ারের পানি, চলাচলের মতো রাস্তা নেই। ফলে ঘরের ভেতরেই সন্তানসহ প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। আমাদের এখানে ভালো রাস্তা নেই, উন্নত স্বাস্থ্যসেবাও নেই। মানুষের সামান্য চিকিৎসা পেতেও অনেক কষ্ট করতে হয়। এই মৃত্যুর দায় অবকাঠামোগত সংকট এড়াতে পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

গভীর সাগরে ভাসতে থাকা হাতিয়ার ১৯ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্ট গার্ড

নোয়খালী প্রতিনিধি: ইঞ্জিন বিকল হয়ে গভীর বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকা নোয়াখালী...

মোশাররফ হোসেনকে স্মরণে জাসদের শোকসভা

নগর প্রতিবেদক: লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা,...

শিক্ষক সমিতির সম্মেলনে শিক্ষার মানোন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস এমপি ফখরুল ইসলাম’র

কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ ফখরুল...

কোম্পানীগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: দুই ফার্মেসি ও এক হোটেলকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা

কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি:নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুইটি...