বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জনস্বাস্থ্য: গভীর রাতে দুর্ভোগের নীরব আর্তনাদ

Date:

গভীর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট কেবল একটি নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়া নয়, বরং তা জনজীবনের জন্য এক মারাত্মক সংকট। বর্তমান সময়ে শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে মফস্বল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বাড়িই পাকা বা ইটের তৈরি। সারা দিন সূর্যের প্রচণ্ড তাপে ভবনগুলোর দেওয়াল ও ছাদ উত্তপ্ত হয়ে থাকে এবং রাতের বেলা সেই জমা হওয়া তাপ ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঘরগুলো ভ্যাপসা গরমে একরকম অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। এমন অসহনীয় পরিবেশে ফ্যান বা এসি ছাড়া ঘুমানো প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাতে একটু শান্তির ঘুমের প্রত্যাশায় থাকে, কিন্তু বিদ্যুৎহীনতার কারণে সেই বিশ্রামটুকুও তাদের কপালে জোটে না। মাঝরাতে হঠাৎ কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে তা যেকোনো সুস্থ মানুষকেও চরমভাবে অসুস্থ করে তুলতে পারে। কিন্তু একবারও কি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ সরকারি হাসপাতালের রুগ্ণ রোগীদের কষ্টের কথা ভেবে দেখেছেন?

পাশাপাশি, আগামীর প্রজন্ম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা নির্বিঘ্ন ঘুম অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন এ ধরনের ব্যাঘাতপূর্ণ ঘুমের কারণে শিশুরা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে স্কুলগামী শিশুরা ক্লাসে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, কিংবা গেলেও পড়াশোনা বা শিক্ষকের পাঠদানে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ফলশ্রুতিতে, তাদের শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ম্লান হয়ে যায়। এভাবে অসম্পূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশু পরবর্তীতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার সঠিক দায়িত্ব পালনে সচেতন বা আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে না।

আজকের দিনে ভেজাল খাবার ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নির্বিঘ্ন ঘুম। কিন্তু গভীর রাতে বারবার লোডশেডিংয়ের ফলে অসুস্থ রোগীরা যেমন আরও শোচনীয় অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন, তেমনি সুস্থ মানুষেরাও নতুন করে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। কারণ, এই ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুৎহীনতা কেবল সাময়িক দুর্ভোগ নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে একটি পুরো জাতিকে অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্ধিত বিল পরিশোধ করার পরও যদি নাগরিকেরা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হন এবং সেই অব্যবস্থাপনার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন-যার শেষ পরিণতি হতে পারে অকালমৃত্যু-তবে এই মৃত্যুর দায় অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের নেয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারা অনুযায়ী স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— “কোনো সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটিলে বা ঘটাইবার উপক্রম করিলে, উক্ত সেবা প্রদানকারী অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড, বা অনূর্ধ্ব পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।”

আজকের দিনে রাষ্ট্র যে একটি কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই এবং পুরো জাতি তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু এই সংকটের আড়ালে যখন ঘুষ বাণিজ্য, ব্যাপক দুর্নীতি এবং কাজে গাফিলতির মতো অনিয়মগুলো নিয়মে পরিণত হয়, তখন  সংকটের এই অজুহাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের এই দুর্দিনেও যারা অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির মাধ্যমে জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, বরং সকল দপ্তরকে দুর্নীতিমুক্ত না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। রাজনৈতিক বক্তব্যে হয়তো রাষ্ট্রকে উন্নয়নশীল বা উন্নত হিসেবে জাহির করার বৃথা চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু তা দেশের সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। অন্যের দ্বারা নিজের অধিকার নিয়মিতভাবে ক্ষুণ্ণ হতে থাকলে একসময় সাধারণ মানুষও তার অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ও প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে। 

হয়তো রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সুযোগ খুব সহজে হয়ে ওঠে না। তাই বলে তারা শাস্তি পাবে না, তা হওয়ার কথা নয়। পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে চলছে এবং চলবে। মানুষ তার গতিপথ পরিবর্তনে আপ্রাণ চেষ্টা করে, তবে সীমা অতিক্রম করলে প্রকৃতি তার বিন্দুমাত্র শাস্তি প্রদানে কার্পণ্য করে না। সুতরাং, ক্ষমতাধর দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের অবহেলার বিরুদ্ধে কেউ সরাসরি আঙুল তুলতে সাহস না পেলেও, মানুষের সৃজিত ও প্রাকৃতিক ন্যায়বোধ লঙঘিত হলে তার নিজস্ব নিয়মে প্রকৃতি ঠিকই যথাযথ শাস্তি প্রয়োগ করবেই।

লেখক-
মেছবাহ উদ্দিন
শিক্ষক ও সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি পেশাই আজ দুর্নীতিমুক্ত নয়

শিক্ষকতাও এর বাইরে নয়। একটি দেশ ও জাতি গঠনের...

মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণে ৭৫১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন, ফখরুল ইসলাম এমপিকে অভিনন্দন, এলাকায় মিষ্টি বিতরণ

নোয়াখালী প্রতিনিধি:নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণসহ ছোট ফেনী ও...

জাসদ নেতার পিতার মৃত্যুতে কেন্দ্রীয় জাসদ’র শোক

টাইম ডেস্ক:জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ নোয়াখালী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক...

কোম্পানীগঞ্জে উপজেলা পরিষদের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন এমপি ফখরুল ইসলাম

নোয়াখালী প্রতিনিধি:নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত...