ক্রিড়াডেস্ক:
সবাই নিশ্চিত ছিলেন গোল্ডেন বল পাবেন লিওনেল মেসি। কিন্তু বিশ্বকাপের পর্দা নামার মুহূর্তে, যখন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভর্তি দর্শকদের মাঝে নেমে এলো অভাবনীয় নিস্তব্ধতা। যা পরক্ষণেই রূপান্তরিত হয় প্রচন্ড হট্টগোলে।
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল, ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা লিওনেল মেসিই জিতবেন আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ গোল্ডেন বলের জন্য বেছে নেয় স্পেনের মাঝমাঠের কারিগর রদ্রিকে।
আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় স্পেন। ফাইনালের পর যখন রদ্রি পুরস্কার নিতে মঞ্চে ওঠেন, তখন উপস্থিত হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী মেসির নাম ধরে চিৎকার করে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ফুটবল সমর্থকদের বড় একটি অংশের মতে, ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আর গোল অ্যাসিস্টের বিচারে রদ্রির তুলনায় মেসি অনেক এগিয়ে ছিলেন। আটটি ম্যাচে আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করে মেসি আক্ষরিক অর্থেই আর্জেন্টিনাকে একার কাঁধে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। পুরো টুর্নামেন্টে পাঁচবার ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতা একজন খেলোয়াড় কেন গোল্ডেন বল পাবেন না, সেই বিতর্ক এখন ফুটবল বিশ্বের অলিগলিতে।
তবে ফিফার মূল্যায়ন পদ্ধতি এবার চিরাচরিত গোল কিংবা অ্যাসিস্টের হিসাবকে ছাপিয়ে গেছে। সংস্থাটির মতে, আধুনিক ফুটবলে একজন খেলোয়াড়ের প্রভাব শুধু তার ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। স্পেনের এই শিরোপা জয়ের নেপথ্যে ম্যানচেস্টার সিটির তারকা মিডফিল্ডার রদ্রি যে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন, তা খালি চোখে অনেকের কাছে ধরা না দিলেও কৌশলের বিচারে তা ছিল অতুলনীয়।
মাঝমাঠের ইঞ্জিন হিসেবে রদ্রি পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হয়েও তিনি যেভাবে রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণের সংযোগ তৈরি করেছেন, তা টুর্নামেন্টের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে ছিল বেশি কার্যকর।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে রদ্রির শ্রেষ্ঠত্বের এক ভিন্ন রূপ ফুটে ওঠে। টুর্নামেন্টের আটটি ম্যাচে তিনি সর্বমোট ৭২৬ মিনিট মাঠে ছিলেন। এই সময়ে তিনি ৬৯২টি সফল পাস দিয়েছেন, যার নিখুঁত হওয়ার হার ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট না থাকলেও মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। পুরো বিশ্বকাপে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে, যার সিংহভাগ কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে রদ্রির রক্ষণাত্মক দক্ষতার ওপর। ১৩ বার সফল ট্যাকল এবং মাঝমাঠ সুতোয় বেঁধে রাখার এই সামর্থ্যই তাকে ফিফার বিচারকদের চোখে সেরা করে তুলেছে।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলগত পরিকল্পনার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এই রদ্রি। গোল করার চেয়ে গোল করানোর পরিবেশ তৈরি করা এবং দলের ভারসাম্য ধরে রাখাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। যেখানে মেসি নিজের ব্যক্তিগত কারিশমায় ম্যাচ জিতিয়েছেন, সেখানে রদ্রি দলকে একটি সুশৃঙ্খল এককে পরিণত করেছিলেন। ফিফার কারিগরি দলের মতে, মেসির গোল করার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে অসাধারণ, কিন্তু পুরো ৯০ মিনিট ধরে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে রদ্রির প্রভাব ছিল অনেক বেশি গভীর।
ফুটবল ইতিহাসে গোল্ডেন বল সাধারণত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের দখলেই বেশি থাকে। গোল স্কোরারদের প্রতি সমর্থকদের এক ধরনের সহজাত আকর্ষণ থাকে, যার ফলে রদ্রির মতো একজন অদৃশ্য নায়ক যখন সেরার মুকুট পান, তখন বিতর্ক ওঠা স্বাভাবিক। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই প্রতিবাদের সুর হয়তো ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। তবে রদ্রির এই অর্জন প্রমাণ করে যে, ফুটবল মানেই শুধু গোল করা নয়, বরং বলের দখল রাখা এবং দলের প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠের প্রতিটি প্রান্ত নিয়ন্ত্রণ করা।
মেসিকে ছাপিয়ে রদ্রির এই জয় ফুটবল বিশ্বের জন্য এক নতুন বার্তা। এটি নির্দেশ করে, আগামী দিনের ফুটবলে পরিসংখ্যানের চেয়ে কৌশলী প্রভাব এবং দলের প্রতি নিবেদনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

